জাতীয়

এলএনজি নির্ভরতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গভীর সংকট দেশীয় অনুসন্ধানে অনীহা ও বিপুল ব্যয়ের বোঝা

ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি – বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সাল থেকে সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেট ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি বৃদ্ধি পায়।

আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের বাংলা আউটলুকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন যে শুরুতে এটি জরুরি সমাধান হিসেবে দেখা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই তা একটি ব্যয়বহুল নির্ভরতায় পরিণত হয়েছে। বিএনপি তাদের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমানে নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয় যে ১০০ দিনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে তাতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন যে এজন্য কক্সবাজারে আরও একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে যে জ্বালানি খাত কি আবারও একটি ব্যয়বহুল আমদানি নির্ভরতার চক্রে আটকা পড়তে যাচ্ছে কি না। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট যার মধ্যে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে এই গ্যাস সরবরাহ করা হয় যার একটির মালিকানা মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও অপরটির মালিক সামিট গ্রুপ। পরিমাণের দিক থেকে এই গ্যাস কম হলেও এর আমদানির চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি সইতে পারছে না। ২০২২ সালে জ্বালানি আমদানির চাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বড় ধরনের ধস নামে। জাপান ও কোরিয়াকে অনুসরণ করে এলএনজি আমদানি শুরু করলেও এই নির্ভরতা আওয়ামী লীগ সরকারের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল এবং জ্বালানি খাতের বিপুল ব্যয় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে বছরে গড়ে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয় এবং প্রতিটির গড় মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা এবং এ সময় ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৩৬ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকার বেশি। পেট্রোবাংলা তার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকেও বড় অংকের অর্থ নিয়েছে যা মূলত জনগণের টাকা দিয়ে গঠিত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৩৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং এলএনজি আমদানির কারণে গ্যাসের দাম ৪০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটারে খরচ যেখানে ৩ টাকা সেখানে আমদানি করা এলএনজির খরচ পড়ে প্রায় ৫৫ টাকা যা প্রায় ১৮ গুণ বেশি। এলএনজি আমদানির চুক্তিগুলো ডলারভিত্তিক হওয়ায় ডলার সংকট বাড়ছে এবং টাকার মান কমছে। পেট্রোবাংলা একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখন তা ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং সংস্থার নিজস্ব এফডিআর শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বা পিডিবির বকেয়া ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

গত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে ট্রিলিয়ন টাকা ব্যয় হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ হয়েছে নামমাত্র। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয়ের প্রাক্কলন স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বরাদ্দের প্রায় ৫১ গুণ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সংকট নিরসনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। একটি মাঝারি আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বছরে হাজার কোটি টাকার আমদানি সাশ্রয় করতে পারে।

এম ম/ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language