হজরত আলী (রা.)-এর চোখে সুশাসন ও ন্যায়বিচারের স্বরূপ

মিসর, ১৪ ফেব্রুয়ারি – সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের মধ্যে সুশাসনের প্রত্যাশা প্রবল হয়ে উঠেছে। ইসলাম ধর্মেও সুশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা এবং বিশ্বনবী (সা.) এর জামাতা হজরত আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞানের এক অনন্য আধার। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এই খলিফা শাসক হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। হজরত আলী (রা.) এর খুতবা, ভাষণ ও চিঠিপত্রের সংকলন ‘নাহজুল বালাগাহ’ গ্রন্থে মিসরের গভর্নর হজরত মালিক আশতারকে লেখা এক চিঠিতে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের যে নির্দেশাবলি রয়েছে, তা সব যুগের শাসকের জন্য অনুকরণীয়।
হজরত আলী (রা.) মালিক আশতারকে লেখা ওই চিঠিতে উল্লেখ করেন যে অন্তরে আবেগ জাগ্রত হলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের প্রবৃত্তি তাকে পাপের দিকে ধাবিত করে। তাই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অবৈধ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা শাসকের কর্তব্য। নাহজুল বালাগার এই নির্দেশনায় ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থিব সমস্যার সমাধান এবং সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ নির্দেশ করা হয়েছে। গভর্নরকে তিনি জনগণের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিচার বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
চিঠিতে তিনি আরও বলেন, শাসকের অন্তর যেন জনগণের প্রতি ক্ষমা, স্নেহ ও দয়ায় পরিপূর্ণ থাকে। প্রজাদের ওপর হিংস্র পশুর মতো আচরণ করা যাবে না। মানুষ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভুল করতে পারে। তাই শাসককে সেভাবেই ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, যেভাবে তিনি নিজে আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা প্রত্যাশা করেন। কারণ শাসকের ওপরে রয়েছেন খলিফা এবং খলিফার ওপরে রয়েছেন মহান আল্লাহ। আল্লাহই তাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়ে পরীক্ষা করছেন।
হজরত আলী (রা.) সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠায় বলেন, ক্ষমা করে লজ্জিত হওয়া বা শাস্তি দিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত নয়। রাগের মুহূর্তে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া বা নিজের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করা শাসকের জন্য শোভনীয় নয়। এমন আচরণ অন্তরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি গভর্নরকে উপদেশ দিয়ে বলেন, যা সর্বাধিক ন্যায়সংগত, সর্বজনীন এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য, সেটাই গ্রহণ করা উচিত। সব ধরনের পার্থিব শাসনব্যবস্থাই পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকিতে থাকে। হজরত আলী (রা.) পক্ষপাতদুষ্ট শাসকদের জালিম এবং মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে কেবল আল্লাহকে ভয় করা শাসকরাই জুলুম থেকে বিরত থাকেন এবং সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি মালিক আশতারকে নির্দেশ দেন যেন তিনি দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে সমাজকে গড়ে তোলেন। হজরত আলী (রা.) এর মতে, সাধারণ জনগণই হলো মুসলমানদের ধর্মীয় শক্তির মূল স্তম্ভ এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরক্ষা। তাই শাসকের উচিত তাদের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। হজরত আলী (রা.) এর এই নির্দেশনা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি প্রকৃত গণমুখী শাসনব্যবস্থার রূপরেখা। ইসলামের চতুর্থ খলিফা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জনগণের স্বার্থরক্ষা এবং তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ শাসকের গুণাবলি তুলে ধরেছেন। কারণ সাধারণ জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ও সুরক্ষা প্রাচীর।
এসএএস/ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









