আইসিজেতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ

ঢাকা, ২৪ জানুয়ারি – আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে মিয়ানমার যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের আদি পরিচয় অস্বীকার করে তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ প্রমাণের এই প্রচেষ্টা মূলত গণহত্যার দায় এড়ানোর একটি কৌশল। বাংলাদেশ মনে করে, মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় মুছে দিতে চাইছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে ২০১৬-১৭ সালে চালানো তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নৃশংসতাকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। অথচ ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, রোহিঙ্গারা আরাকানের একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে বার্মিজদের দখলের বহু আগে থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এমনকি ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকারও ছিল। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করা হয় এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল—মিয়ানমারের এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। সরকার বলছে, এ দাবির পক্ষে মিয়ানমার কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তৎকালীন রাখাইনের জনসংখ্যার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটলে তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হতো এবং বড় ধরনের আর্থ-সামাজিক সংকট সৃষ্টি হতো।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু মিল থাকলেও তারা একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতি রয়েছে। তাদের ‘বাঙালি’ বলা কেবল পরিচয় বিতর্ক নয়; এটি তাদের মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার একটি হাতিয়ার।
বাংলাদেশ আরও জানায়, গত আট বছরেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার কোনো কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বারবার কালক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা নির্মূলের অশুভ উদ্দেশ্যেরই প্রতিফলন।
বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—রোহিঙ্গাদের নিজস্ব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এনএন/ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬









