খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ ছিল কি না, প্রশ্ন তুললেন চিকিৎসক

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি – সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী। তার দাবি, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি এই পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানান।
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল করোনা সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বর্তমান মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। ওই সময় থেকেই ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হওয়ার পরপরই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তখন তারা বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। অথচ এর আগে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে তার জন্য আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় মেথোট্রেক্সেট নামের একটি ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার নির্দেশ ছিল এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ও তাকে এই ওষুধ দেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা সঙ্গে সঙ্গেই ওষুধটি বন্ধ করে দেন।
এফ এম সিদ্দিকী জানান, খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভুগছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শেই তিনি মেথোট্রেক্সেট সেবন করছিলেন। এর পাশাপাশি তার এমএএফএলডি বা মেটাবোলিক অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজও ছিল।
তিনি আরও বলেন, এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো—খালেদা জিয়ার লিভারের রোগ নির্ণয় করা মোটেও কঠিন ছিল না, এর জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। মেথোট্রেক্সেট সেবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে লিভার ফাংশনের বিভিন্ন উপাদান দেখা বাধ্যতামূলক। যদি সেখানে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়, তাহলে ওষুধটি বন্ধ করে অন্তত একটি পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা যাচাই করা দরকার। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকেরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং মেথোট্রেক্সেট বন্ধও করেননি।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে খালেদা জিয়া সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে রাজি হননি। তবে অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় তার বিশ্বাসযোগ্য চিকিৎসকের মাধ্যমে শয্যার পাশেই পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড বা পিওসিইউএস করা যেত। অন্তত মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করা ছিল চিকিৎসকদের অবশ্যকর্তব্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনেকে খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্ন করেন উল্লেখ করে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, তার মতে মেথোট্রেক্সেটই সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভারের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে তা লিভার সিরোসিসে রূপ নেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি তার লিভারের জন্য কার্যত একটি ‘স্লো পয়জন’ ছিল।
বক্তব্যে আবেগের সঙ্গে তিনি বলেন, আজ দেশের লাখো-কোটি মানুষের মনে গভীর আফসোস কাজ করছে—যিনি সারাজীবন গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তিনি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন। যদি তিনি দেখে যেতে পারতেন, মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে।
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এর পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে।
নাগরিক শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। এছাড়া সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ, মনির হায়দার, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ বিএনপির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা।
এনএন/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬









