অপরাধ

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি হাজার কোটি টাকা অর্থপাচার করেছেন

ঢাকা, ০৫ ফেব্রুয়ারি – বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) সূত্রে জানা যায় অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পৃথক তদন্ত পরিচালনা করছে। সংস্থাটির একজন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ডলার কারসাজি, অর্থ পাচার, এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু মহল এই তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করারও চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

দুদকের তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফরহাদ হোসেন নামে একজন অভিযোগকারী কমিশনে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুরুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলী, সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদার, পরিচালক ফাহিম আহমেদ ফারুক এবং পরিচালক খবিরুজ্জামান ইয়াকুবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে দুদক তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিবরণ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির বর্তমান ও সাবেক কর্তাব্যক্তিরা ব্যাপক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:

# ব্যাংকের অর্থ লুটপাট ও অনিয়মিত ঋণ বিতরণ।

# বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম এবং ডলার কারসাজির মাধ্যমে অর্থ পাচার।

# ব্যাংকের সম্পদ স্বল্পমূল্যে বিক্রি।

# ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ববর্তী এক তদন্তেও পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, যা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী, যিনি প্রয়াত এইচ টি ইমামের ভাগনে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটিতে স্বেচ্ছাচারীভাবে লেনদেন পরিচালনা করে আসছেন।

২০২৩ সালে ব্যাংকের একটি সিন্ডিকেট বিদেশি মুদ্রা কারসাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে। বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ডলার কেনার সময় প্রায় ২১১ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়।

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স সংক্রান্ত দুর্নীতি
পূবালী ব্যাংকের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির বিষয়েও তদন্ত চলছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ২৫ লাখ গ্রাহকের আমানতের ১,১৪১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি তার চার সন্তানকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন এবং কন্যা আদিবা রহমানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেন। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটির ২,৯০০ কোটি টাকা আত্মসাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডাটাবেজের তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদারের বিরুদ্ধেও বিশদ অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার সময়কালে পরিচালনা পর্ষদের ১০ সদস্যকে অনিয়ম ও জালিয়াতির দায়ে অপসারণের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠজনেরা ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে ছিলেন। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।

আইএ/ ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫


Back to top button
🌐 Read in Your Language