
ঢাকা, ২৩ জানুয়ারি – দলকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দলকে শক্তিশালী করার জন্য সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার একাধিক নজির স্থাপন করেছে আওয়ামী লীগ। তবে এ নিয়ে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন আছে। তারা বলছেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঝুঁকি মনে করলে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কেন?
অবশ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, সংগঠন শক্তিশালী করার জন্যই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সেই সিদ্ধান্ত দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে মূলত এমন মনে হলে সরে আসতে হয়। তারা বলেন, এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বাস্তবায়ন করতেই হবে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘প্রত্যেকটি দলের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা থাকে। তেমনি সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য নানা পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে হয় আওয়ামী লীগকে। এ বিষয়টি পুরোপুরি সময় ও প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে।’
দলকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘটনায় দলের প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বেশ অসন্তুষ্ট। কেন্দ্রীয় কোনো কোনো নেতা অসন্তুষ্ট থাকলেও প্রকাশ্যে বলার সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তারা। তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন মনোভাব জানা গেছে।
দলটির সভাপতিমন্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য বলেন, সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে না পারার কারণে দলের শৃঙ্খলাও ধরে রাখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ওই নেতার দাবি, যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে মনে করা হয় সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কেন?
আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা দাবি করেন, জেলা-উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দল বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। দলীয় ঐক্য নষ্ট হওয়ার অন্যতম একটি কারণও সিদ্ধান্তে অটল থাকতে না পারা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরে এলে অপরাধীরা অপরাধ করতে ভয় পায় না। গত এক যুগে বেশি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগে।
তারা মনে করেন, এ কারণেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দলীয় ঐক্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগামী নির্বাচনের আগে ঐক্যের এ মিশন কতখানি সফল হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ভেতরে। কারণ ত্যাগী ও আদর্শে অটল নেতাকর্মীদের হাতে এখন দল নেই। ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ এখন পাঁচমিশালি নেতাকর্মীতে পূর্ণ। ক্ষমতার এক যুগে এই পাঁচমিশালি নেতাকর্মীদের শেকড় অনেক গভীরে চলে গেছে। ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে থাকা এক নেতা বলেন, গত ১৪ বছরে দলে একটি বড় প্রেশার গ্রুপ তৈরি হয়েছে। ওই গ্রুপটি ভুলভাল বুঝিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে নেতৃত্বকে চাপে রাখে। ফলে দলের নেতাকর্মী ও দলের বাইরে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে আস্থা রাখতে পারে না।
গত ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত চার বছরেই কমপক্ষে ২০টি সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা থেকে এসেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার ৮১ সদস্যের এ কমিটির। অন্য ফোরামেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের স্বার্থে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেন। পরে কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সেসব চূড়ান্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতেও ওই সভা করতে হয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দল ও সরকার আলাদা হবে। এ নীতি অনুসরণের কারণে ১৪ দলীয় জোটের কোনো নেতাকেও রাখা হয়নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃতীয় দফার মন্ত্রিসভায়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমকে দলের আইন সম্পাদকের পদ ছাড়তে হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হক চৌধুরী নওফেল মন্ত্রীর চেয়ারে বসায় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ ছাড়তে হয়েছে। অপরদিকে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ সাধারণ সম্পাদক, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থেকেও তারা মন্ত্রী।
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যিনি সংসদ সদস্য হবেন তিনি তৃণমূলে কোনো পর্যায়ের কমিটিতে শীর্ষ দুই পদে থাকতে পারবেন না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয় আওয়ামী লীগ থেকে। ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার ৪০টিরও বেশি জেলায় সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন সংসদ সদস্যরাই। ওই সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একাধিক জেলায় সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক দুজনই দলীয় সংসদ সদস্য। উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও ওই সিদ্ধান্ত মানা হয়নি।
২০১৪ সালে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইন করা হয়। ওই আইনে ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে স্থানীয় সকল পর্যায়ে নির্বাচন প্রথম শুরু হয়। ওই নির্বাচনে অধিকাংশ এলাকায় দল মনোনীত প্রার্থীকে তৃণমূল আওয়ামী লীগ সাদরে গ্রহণ করেনি। অথবা দলীয় সংসদ সদস্যের পছন্দ হয়নি নৌকা প্রতীক পাওয়া ওই প্রার্থীকে। ফলে দলেরই আরেকজন বিদ্রোহ করে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে নেমে পড়েন। ওই স্থানীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর চেয়ে বিদ্রোহী ও বিএনপির প্রার্থীরা বেশি জয়লাভ করে। দলীয় প্রতীকে প্রথম নির্বাচন হওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে তেমন কোনো শক্ত অবস্থানে যায়নি আওয়ামী লীগ।
বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূল আওয়ামী লীগের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংগঠনিক ইউনিটগুলোকে তৃণমূল থেকে ভোটাভুটি করে অথবা সমঝোতার ভিত্তিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। এজন্য ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। ওই বোর্ডের সভাপতিও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ওই বোর্ডই চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করবে। কেন্দ্র থেকে আরও বলা হয়, তৃণমূল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী যার নাম আগে আসবে তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যায়, তৃণমূলের তালিকায় নাম আসেনি কিন্তু মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারগুলোও তৃণমূলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। বিদ্রোহের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয়ে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে তাদের দল থেকে বহিষ্কার ও প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের বহিষ্কারের সুপারিশ করে কেন্দ্রকে।
২০২১ সালে স্থানীয় সরকারের অধীনে সিটি করপোরেশন মেয়র, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ভোট শুরু হয়। ভোটে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন যে কেউ। তিনি বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ জিতুক সেটা চায় না আওয়ামী লীগ। এই ঘোষণায় স্থানীয় নির্বাচনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সকলে।
দলের শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ায় আওয়ামী লীগ আবারও সিদ্ধান্ত নেয় বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকে বহিষ্কার করা হবে। তবুও ভয়হীন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তারা মনে করতেন, ভোটে জিততে পারলে বহিষ্কার করা হবে না। ফলে নির্বাচন হলেই কেন্দ্র কঠোর অবস্থানে থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর লাগাম টানা যায়নি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশও আসে।
গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে বলেন, এই জেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয় গত ডিসেম্বরে। সেখানে তৃণমূল থেকে তিনজনের নাম পাঠানো হয়। পরে দেখা যায়, মনোনয়ন বোর্ড এমন একজনকে মনোনয়ন দিয়েছে, যার নাম কেন্দ্রে পাঠানোই হয়নি।
সর্বশেষ গত বছর ১৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় বিদ্রোহী ও বিদ্রোহীদের মদদদাতাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করার দায়ে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে বহিষ্কার করা হয়। ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। পরে মেয়রের দায়িত্ব থেকেও সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত হন তিনি। কিন্তু অপরাধ ভিন্ন হলেও স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতাদের সাধারণ ক্ষমার আওতায় তার বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হয়।
সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ২৩ জানুয়ারি ২০২৩









