নারায়নগঞ্জ

অগ্নিঝুঁকিতে রূপগঞ্জের আরও ৩৫ কারখানা

আতাউর রহমান সানী

নারায়ণগঞ্জ, ১৮ জুলাই – নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চলতি বছরে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার বেশিরভাগই শিল্পকারখানায়। কারখানাগুলোর মালিকপক্ষের অসাবধানতা-অবহেলা এবং অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার ঘাটতিকে এসব অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিকের প্রাণহানির পর নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ রূপগঞ্জের আরও কমপক্ষে ৩৫টি শিল্পকারখানাকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব কারখানায় নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি। ফলে আগুন লাগলে হাসেম ফুডসের কারখানার মতো বড়সংখ্যক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস পরিদর্শকরা শিল্পকারখানাগুলোকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখে না বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শুরু হয় তাদের দৌড়ঝাঁপ। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। হইচই চলে কয়েক সপ্তাহ। এরপর থেমে যায় সবকিছু।

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে রূপগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। ঢাকার খুব কাছে এবং রাজউকের পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প গড়ে ওঠায় এই উপজেলাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ উপজেলায় পোশাক, ভোগ্যপণ্য, বেভারেজ ও স্টিল মিলসহ ছোট-বড় মিলে বিভিন্ন ধরনের ৯৯৬টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। কারখানাগুলোর বেশিরভাগই ভুলতা, গোলাকান্দাইল, তারাব, বরপা ও রূপসী এলাকায়। এসব কারখানার সিংহভাগেই নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা। রূপগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোয় ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকরা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে বেশিরভাগ কারখানাই ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনাগুলো মানে না। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এত বেশি ঘটছে। রূপগঞ্জের কারখানাগুলোর বেশিরভাগই বাইরে থেকে প্রধান ফটক ও কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ ছাড়া কারখানার ভেতরের প্রতিটি তলার সিঁড়ির মাথায়ও ছোট ছোট গেট রয়েছে বলে শ্রমিকরা জানিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কারখানার ১৮ শতাংশ কর্মীকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ছয় মাসের কোর্স করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর দুর্ঘটনাকালে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ওই ১৮ শতাংশ কর্মীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কারখানা কর্র্তৃপক্ষের একজন সেফটি অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। ওই কর্মকর্তা অন্য কোনো কাজ করবেন না, তিনি শুধু কারখানার ফায়ার সেফটির বিষয়টি দেখবেন। ফায়ার সেফটি অফিসার পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কোনো কর্মকর্তা অথবা ছয় মাসের প্রশিক্ষণপাপ্ত অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে রূপগঞ্জের বেশিরভাগ শিল্পকারখানা এসব নির্দেশনা মানছে না।

ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের অধীনে রূপগঞ্জ উপজেলায় আরিফ ও শাহ আলম নামে দুজন পরিদর্শক দায়িত্বরত আছেন। তারা দুজন শিল্পকারখানাগুলোয় অগ্নিনির্বাপণ ও অগ্নিকাণ্ডবিষয়ক ত্রুটিবিচ্যুতি তদন্ত করে ফায়ার লাইসেন্স প্রদান করেন। কিন্তু এই দুই কর্মকর্তা কারখানাগুলো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ না করেই লাইসেন্স প্রদান করেন বলে অভিযোগ করেছেন কারখানার শ্রমিক ও এলাকাবাসী।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রূপগঞ্জের ভুলতা, গোলাকান্দাইল, কাঞ্চন, সাওঘাট, কালাদীসহ আশপাশের এলাকায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে রূপগঞ্জের তারাব ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া পূর্বাচল উপশহরের আশপাশেও কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে পুরো উপজেলায় গত সাত মাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ৫০টির বেশি।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের তথ্যমতে, রূপগঞ্জে বর্তমানে কমপক্ষে ৩৫টি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ও বড় প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানার মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে হাসেম ফুডের মতো আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সর্বশেষ ৮ জুলাই রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুড কারখানার ছয়তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কমপক্ষে ৫২ শ্রমিক নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক। আহত ও নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শিশু। এর আগে গত ২১ জুন একই ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন ১০ জনের মতো শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে রূপগঞ্জের সিম গ্রুপে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চলতি বছরে এনজেড টেক্সটাইল ও গোলাকান্দাইল এলাকার প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মালিকপক্ষের অসাবধানতা, বৈদ্যুতিক গোলযোগ এবং কারখানার ভেতরে ধূমপানসহ বিভিন্ন কারণে অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনা ঘটে।

হাসেম ফুডে কর্মরত শ্রমিকরা অভিযোগ করে জানিয়েছেন, হাসেম ফুডে অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে মালিকপক্ষের অবহেলার কারণে। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ছাড়াও কারখানার অন্যান্য ভবনেও অব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত এক্সিট পয়েন্ট, আগুন নেভাতে পর্যাপ্ত পানির মজুদ ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এছাড়া কারখানার ওই ভবন নির্মাণের সময় বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। ওই ভবনে ওয়াটার রিজার্ভার, পর্যাপ্ত এক্সিট পয়েন্ট এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক জিল্লুর রহমান (অপারেশন) ও জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। হাসেম ফুডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (রূপগঞ্জ) তানহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রূপগঞ্জের ৩৫টির বেশি শিল্পকারখানা অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। শুকনো খাবার তৈরির পাশাপাশি স্টিল মিল ও পোশাক কারখানা এবং টেক্সটাইল মিল কারখানাও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার তালিকায়। এ ছাড়া অনেক কারখানাতেই নেই অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা। নেই ইমার্জেন্সি এক্সিট ডোরও।’

ঝুঁকি এড়াতে ফায়ার সার্ভিস কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব কারখানায় অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা কম ও ইমার্জেন্সি এক্সিট ডোর নেই, আমরা তাদের নোটিস করে থাকি। নোটিস না মানলে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো হয়।’

ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে তানহারুল ইসলাম বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকদের পর্যবেক্ষণে অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। পরিদর্শকরা সঠিকভাবেই কারখানা পর্যবেক্ষণ করেন। ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টররা কারখানা পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা পালনে ত্রুটি পেলে কারখানা কর্র্তৃপক্ষকে নোটিস করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়। হাসেম ফুড কারখানায় ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা পালনে ত্রুটি খুঁজে পাওয়ায় তাদেরও নোটিস করা হয়েছিল।’

সূত্র : দেশরুপান্তর
এন এইচ, ১৮ জুলাই


Back to top button
🌐 Read in Your Language