নারায়নগঞ্জ

রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে ১৫০ কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্য, তবে হতাশ তাঁতিরা

রূপগঞ্জ, ১৬ মার্চ – ঈদের আনন্দকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিতে এখন বিপুল কর্মচাঞ্চল্য। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকছে এই এলাকা। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এবারের ঈদে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রি হবে। বাজারে মসলিনের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত এই জামদানি শাড়ির প্রচুর চাহিদা থাকলেও কারিগরদের আয়ের চিত্র মোটেও সন্তোষজনক নয়। বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জামদানি শাড়ি। ঈদের সময় স্বাভাবিকভাবেই এর চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়।

এখানকার তৈরি পানা হাজার, তরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খি, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার ও জলপাড়সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় নকশার শাড়ি ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরের শোরুমগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই কাপড়। তাঁতিদের মতে, প্রতি বছরই ঈদের আগে কাজের চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী নিত্যনতুন নকশা ফুটিয়ে তুলতে তাদের দিনরাত একটানা পরিশ্রম করতে হয়। বর্তমানে জামদানি পল্লিতে প্রায় ৩০টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখান থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা সরাসরি কেনাকাটা করেন। শুধু শাড়ি নয়, জামদানির কাপড়ে এখন পাঞ্জাবি, থ্রি পিস এবং শিশুদের দৃষ্টিনন্দন পোশাকও তৈরি হচ্ছে।

তবে ব্যবসার প্রসার ঘটলেও কারিগরদের অবস্থা ভালো নেই। স্থানীয় সূত্র মতে, কয়েক বছর আগেও প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি এই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে সাড়ে তিন হাজারে নেমে এসেছে। উপযুক্ত পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন। পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি তৈরি হলেও কারিগররা একটি শাড়ি বুনতে ১৫ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় ব্যয় করেন। এর বিনিময়ে তারা ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা মজুরি পান, যা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। দীর্ঘ দশ বছর ধরে এই পেশায় থাকা তাঁতি মালেক জানান, সপ্তাহে তিন হাজার টাকা হিসেবে মাসে তার আয় হয় মাত্র বারো হাজার টাকা।

এই সামান্য অর্থ দিয়ে বর্তমানে সংসার চালানো খুবই কঠিন। একই কথা জানান অপর দুই তাঁতি মোশারফ ও মুক্তা বেগম দম্পতি। ১৫ বছর ধরে তারা জামদানি বুনছেন এবং দুজন মিলে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। জামদানি ব্যবসায়ী মো. আ. মতিন জানান, গত কয়েক বছর বাজার মন্দা থাকলেও এবার তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে ক্রেতারা বেশি অর্ডার দিচ্ছেন এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিদের মজুরি বাড়ানো যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। আরেক ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম কাশেম বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি রপ্তানি হচ্ছে এবং মেলার মাধ্যমে এই শিল্পকে তুলে ধরা হচ্ছে। বিসিক জামদানি পল্লীর শিল্প নগরী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, সরকারি উদ্যোগে তাঁতিদের সহায়তার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এবারের ঈদে ১৫০ কোটি টাকার বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি তাঁতিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ চলছে।

এস এম/ ১৬ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language