ইসলামের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের মর্যাদা
সন্তানের জীবনে বাবার অবদান অনস্বীকার্য। কোনো সন্তান বাবার ঋণ কখনো পরিশোধ করতে পারে না। কঠোর শাসন, কোমল ভালোবাসা আর ত্যাগে অগ্রগামী যিনি, তিনিই তো বাবা। বাবারা যেকোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট অকাতরে সহ্য করেন। সব সময় চেষ্টা করেন সামান্য কষ্টও যেন সন্তানকে স্পর্শ না করে। সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তার পরও বাবাদের সঙ্গে আমাদের সমাজের অনেকেই খারাপ আচরণ করে থাকেন। এটা ইসলাম-বিরুদ্ধ কাজ। এ কাজের প্রতি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ইসলামে।
আল্লাহর কাছে প্রিয় কাজ : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ পড়া। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।’সহিহ বোখারি
বর্ণিত হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, মহান আল্লাহর তিনটি অতি প্রিয় কাজের মধ্যে একটি হলো বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল যোগ হতে থাকে ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. কল্যাণময় শিক্ষা ও ৩. এমন সৎ সন্তান যে মৃত বাবা-মায়োর জন্য দোয়া করে।’সহিহ মুসলিম
এই হাদিসে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন জনসেবার কাজ, যা দ্বারা বছরের পর বছর মানুষ উপকৃত হয়। তা দ্বারা যত দিন মানুষ উপকৃত হবে, তত দিন এই সেবাদানকারীর আমলনামায় সওয়াব যোগ হবে। আর ‘কল্যাণময় শিক্ষা’ বলতে এমন জ্ঞান ও শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, যার ফলে মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম আল্লাহর পথে চলতে থাকে। আর সৎ সন্তানের বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট। হাদিসে আছে, মৃত ব্যক্তির জন্য সৎ সন্তানের দোয়া অনেক উপকারী।
জন্মদাতা ছাড়া অন্যকে বাবা বলে সম্বোধন : জন্মদাতা বাবাকে আমরা বাবা বা আব্বা বলে ডাকি। সম্বোধন হিসেবে এটা নতুন নয়। বাবার সমার্থবোধক অনেক শব্দ সমাজে প্রচলিত। তবে অঞ্চল ও ভাষাভেদে এর হেরফের অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইসলাম জন্ম-পরিচয়ের সূত্র প্রকাশের সময় আপন বাবা ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে নিজের পরিচয়কে সম্পর্কযুক্ত করতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছে। এমনকি ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, ভক্তি-শ্রদ্ধা, সম্মান প্রদর্শনসহ অন্য যেকোনো কারণ দেখিয়েই হোক না কেন, জন্মদাতা ছাড়া অন্যকে বাবা বলে ডাকতে বা পরিচয় দিতে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামের এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, বাবার প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবেই ইসলাম পিতৃত্বের পরিচয়কে সুসংহত করে বাবার মর্যাদাকে উচ্চাসনে বসিয়েছে।
মা-বাবার জন্য দোয়া : মা-বাবার প্রতি সন্তানের জন্য যেমন কিছু করণীয় রয়েছে, অনুরূপভাবে সন্তানের ওপরও মা-বাবার জন্য অবশ্যকরণীয় কিছু দায়িত্ব আছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘ইরশাদ হয়েছে, ‘…তোমরা বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ করো। তাদের একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাদের প্রতি উহ শব্দটিও উচ্চারণ করবে না এবং তাদের ধমক দেবে না। তুমি তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো। আর তাদের প্রতি অনুকম্পায় বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াপরবশে লালন-পালন করেছিলেন।’সুরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪
উল্লিখিত আয়াতে প্রথমে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামান্যতম বন্দেগি করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার। এ দুটি নির্দেশ একসঙ্গে দেওয়ার অর্থ হলো, প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও মা-বাবার বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। মা-বাবার মাধ্যমে শৈশবে সন্তানের প্রতি যে দরদ-মায়া ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ প্রকাশ পায়, সেই আচরণের কথা স্মরণ করে দিয়ে মহান আল্লাহ মা-বাবার প্রতি রহমত কামনা করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। মা-বাবার জন্য মহান আল্লাহ সরাসরি দোয়া করার নির্দেশ দিয়ে তাদের সম্মান যে কত উঁচু সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
মা-বাবার অবাধ্যতা : ইসলাম মা-বাবার অবাধ্যতাকে কবিরা গোনাহ বলে সাব্যস্ত করেছে। হাদিসে কবিরা গোনাহের বিবরণের সময় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শিরক ও মা-বাবার নাফরমানিকে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। অন্য হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ।’সহিহ বোখারি
মা-বাবার দেখভাল করা ও তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা শরিয়ত কর্তৃক ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, এ সময়ে সমাজের অনেক মা-বাবা ও সন্তান তাদের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন। দুনিয়ার মোহে পড়ে, মানবতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ঝামেলামুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে থাকার নিমিত্তে সন্তানরা বাবা-মাকে নিজের সংসার থেকে বোঝা মনে করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ আশ্রয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।
অন্যদিকে, অনেক সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্পদের মালিকানা নিজের নামে লিখে নেওয়ার চেষ্টা করে। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বৃদ্ধ মা-বাবারা নানাভাবে, নানা কারণে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন। এসব জঘন্য পাপের কাজ, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলাম মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোনো অবস্থায়ই মা-বাবাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবহেলা-অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।
মা-বাবা তুলে গালাগাল : গালাগাল কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। গালাগালের অনেক মন্দ দিক রয়েছে। এটা গোনাহের কাজ। আরও দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ যে অশ্লীল গালিগুলো দেয়, তার বেশির ভাগই মা-বাবাকেন্দ্রিক। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘কবিরা গোনাহগুলোর একটি হলো নিজের মা-বাবাকে অভিশাপ দেওয়া। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসুল! মানুষ নিজের মা-বাবাকে কীভাবে অভিশাপ করে? তিনি বললেন, যখন সে অন্যের বাবাকে গালাগাল করে, তখন সে নিজের বাবাকেও গালাগাল করে থাকে। আর যে অন্যের মাকে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার মাকেও গালি দেয়।’সহিহ বোখারি : ৫৯৭৩
অন্য বর্ণনায় আছে, কেউ কারও মা-বাবা তুলে গালি দিলে অন্যরাও প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার মা-বাবাকে গালি দেয়। একাধিক হাদিসে গালি দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কবুল হজের সওয়াব : মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে একটি কবুল হজের সওয়াব পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো সদাচারী ছেলেমেয়ে যদি তার মা-বাবার দিকে দয়া-মায়ার দৃষ্টিতে তাকায়, তাহলে আল্লাহতায়ালা তাকে প্রত্যেকবার তাকানোর বিনিময়ে একটি কবুল হজের সওয়াব দান করবেন। সাহাবারা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেউ যদি দিনে একশবার মা-বাবার দিকে তাকায়? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আল্লাহতায়ালা অনেক বড় ও সর্বোত্তম সত্তা।’শোয়াবুল ইমান : ৭৮৫৬
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর : মা-বাবার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তানের বেশ কিছু করণীয় রয়েছে। এর অন্যতম হলো তাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। এ ছাড়া আরও যেসব কাজ করা দরকার সেগুলো হলো মা-বাবা বেঁচে থাকতে কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারও ওপর জুলুম করে থাকলে অথবা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তাদের পক্ষ থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া অথবা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়া। মা-বাবার মাগফিরাত কামনায় ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির নিয়তে অভাবগ্রস্ত লোকদের খুঁজে দান-সদকা করা (উত্তম হচ্ছে সদকায়ে জারিয়া করা। যেমন মানুষের সুবিধার জন্য রাস্তা তৈরি করা, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা, মসজিদ নির্মাণ করা, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা ইত্যাদি)। যদি মা-বাবার কোনো রোজা কাজা হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ইন্তেকালের পর তাদের পক্ষ থেকে রোজা রাখা। মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ অথবা ওমরাহ পালন করা। তাদের রুহের মাগফিরাতের জন্য যেকোনো ধরনের নফল ইবাদত করা। এর দ্বারা তারা উপকৃত হবেন, তাদের আত্মা খুশি হবে। আমরা তাদের রুহানি ফয়েজ লাভ করব। মা-বাবার কোনো ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করার চেষ্টা করা। তাদের কবর জিয়ারত করা। এর মাধ্যমে সন্তান ও মা-বাবা উভয়ই উপকৃত হবেন।
মা-বাবা যেসব ভালো কাজ চালু করে গেছেন, তা যেন অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। মা-বাবা কোনো ভালো কাজের ওয়াদা করে গেলে যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তদ্রুপ তারা কোনো গোনাহের কাজ চালু করে থাকলে তা বন্ধ করা অথবা শরিয়তসম্মতভাবে সংশোধন করার চেষ্টা করা। মা-বাবার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। মা-বাবার বন্ধুদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদের দেখতে যাওয়া ও সাধ্যমতো হাদিয়া দেওয়া।
এস সি









