জাতীয়

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪ জেলার ২৯ বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প

মৎস্য অধিদপ্তর

ঢাকা,০৮ নভেম্বর-দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানো এবং মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এসব এলাকায় মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই চার জেলা হলো যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া। দীর্ঘ ১৫ বছর পর জেলাগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ নামে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বাঁওড় বা মরা নদী খনন, মাছের অভয়াশ্রম তৈরি, পোনা উৎপাদনের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৫ সালে যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ওই অঞ্চলের বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের জনবল কাঠামো অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে জনবল কাঠামোর অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাঁওড়ের নির্দিষ্ট কিছু অংশ খনন করে গভীরতা ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজের জন্য ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।

দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া আগে থেকে থাকা ৩৫টি পোনা উৎপাদনের পুকুর সংস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, খামারের কাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পানি সরবরাহের জন্য ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে বাঁওড় ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, পোনা সরবরাহ এবং সম্প্রসারণ সেবার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জরাজীর্ণ ছয়টি বাঁওড় ব্যবস্থাপকের অফিস ভবন পুনর্নির্মাণে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং রুই ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করার জন্য আলাদাভাবে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। বিল নার্সারির মাধ্যমে পোনা লালন-পালন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত জলাশয়ে পোনা ছেড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনার জন্য ৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে জলাশয় খনন, অভয়াশ্রম তৈরি, পোনা উৎপাদন, পানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণের মতো বিভিন্ন কার্যক্রম রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানোই নয়, বাঁওড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এ জন্য নির্দিষ্ট জলাশয় চিহ্নিত করে অভয়াশ্রম তৈরি, মাছের নিরাপত্তায় নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অভয়াশ্রমের নির্ধারিত এলাকায় মাছ ধরা নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যাতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার বাঁওড় বা মরা নদীতে মাছের উৎপাদন বাড়ানো এবং দরিদ্র মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে সরকারের একটি সম্পর্ক তৈরি হবে।

তিনি বলেন, অনেক বাঁওড় অগভীর হয়ে যাওয়ায় সেখানে মাছের বসবাস ও উৎপাদনের উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাশয়গুলোর উন্নয়ন এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা তৈরি করাও এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর সদস্যদের তালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ করা হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকাভুক্ত করা, তাদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মাছ ধরার সুফল সবার মধ্যে সুষমভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাঁওড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জেলেদের জীবিকা ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণ হলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এর সুফল পাওয়া যাবে।

এস এম/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language