কক্সবাজার

১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপে মিলল লকেট পরা কঙ্কাল! ইনানীর পুড়ে যাওয়া রিসোর্ট থেকে উদ্ধার স্কুলশিক্ষিকার দেহাবশেষ

কক্সবাজার, ২৭ অক্টোবর – ভোরের আলো ফোটার ঠিক পরপরই দুই বান্ধবী মিলে গিয়েছিলেন সমুদ্রসৈকতের বাতাসে হাঁটতে। আর রিসোর্টের কক্ষে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলেন সাভারের আশুলিয়ার স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা। ভোরের সেই সামান্য সময়ের ব্যবধানই যে তাদের জীবনের চিরতরে শেষ বিচ্ছেদ হয়ে দাঁড়াবে, তা কে জানত! সমুদ্রের বাতাস মেখে দুই বান্ধবী রিসোর্টে ফিরে এলেও আগুনের লেলিহান শিখা থেকে আর ফেরা হয়নি মুক্তার।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের টানা ১০ দিন পর অবশেষে মিলল নিখোঁজ শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার দেহাবশেষ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েক ঘণ্টার চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে তার দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। দীর্ঘ ১০ দিন পার হয়ে যাওয়ায় দেহাবশেষটি অনেকটা কঙ্কালসদৃশ হয়ে পড়েছিল। তবে ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা ছাইয়ের মাঝে গলায় থাকা লকেটটি দেখে স্ত্রীর দেহাবশেষ শনাক্ত করেন তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল।

শিক্ষিকা মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ইনানীর পাটুয়ারটেকের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে।

যেভাবে উদ্ধার হলো মুক্তার দেহাবশেষ:

আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন নাসরিন আক্তার মুক্তা। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজার ভ্রমণে এসে উঠেছিলেন শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে। মুক্তার স্বামী ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান ফয়সাল জানান, অগ্নিকাণ্ডের দিন ভোরে দুই বান্ধবী সৈকতে হাঁটতে গেলে মুক্তা ঘরেই ঘুমাচ্ছিলেন। আগুন লাগার পর দুই বান্ধবী প্রাণে বাঁচলেও আগুনের ফাঁদে আটকা পড়েন মুক্তা।

সোমবার রাতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আগুনে নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্তের কথা জানালেও, সেখানে মুক্তার কোনো সন্ধান মেলেনি। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সাথে ওই ১০ জনের মিল না থাকায় নিখোঁজ মুক্তাকে নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এরপরই মঙ্গলবার সকাল থেকে উখিয়া থানা পুলিশ রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ, নালা ও আশপাশের ঝোপঝাড়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, সিআইডির তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মঙ্গলবারের এই বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালিত হয় এবং দুপুর আড়াইটায় কঙ্কালসদৃশ দেহাবশেষ উদ্ধার সম্ভব হয়।

কান্নায় ভাসল স্বজনেরা: ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর

মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধারের দিনই ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া আগের ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের পর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের হিমঘর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব মরদেহ স্বজনদের হাতে তুলে দেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।

নিহতদের পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডে ঢাকার দুটি পরিবারের সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে:

প্রথম পরিবার (৪ জন): ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই শিশু কন্যা রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

দ্বিতীয় পরিবার (৬ জন): ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছরের শিশুসন্তান মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ছোট ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)।

নিহতদের মধ্যে নাফিস তেহামি (জেরিফ) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী, মৌলিতা মেহজাবিন পড়তেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে এবং লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। একই দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এমন উদীয়মান তরুণ-তরুণী ও অবোধ শিশুদের করুণ মৃত্যুতে পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এনএন/ ২৭ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language