স্পেনে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ

মাদ্রিদ, ০৪ অক্টোবর-আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় জরুরি আইন পাস না হওয়ায় স্পেনজুড়ে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নেমেছেন।
শনিবার রাজধানী মাদ্রিদসহ ভ্যালেন্সিয়া, বার্সেলোনা ও অন্যান্য শহরে প্রায় ৫০টি সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ তহবিলের ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
সরকারের প্রস্তাবিত আবাসন সংস্কার আইন সংসদে পাস না হওয়াকে কেন্দ্র করে এবারের বিক্ষোভের মূল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার স্পেনের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট সরকারের দুটি জরুরি আবাসন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এর পরদিনই দেশজুড়ে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের দাবি, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তবে সরকারি হিসাবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। ফলে বিক্ষোভে কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে আয়োজক ও সরকারের হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
৮৭ বছরের বৃদ্ধার উচ্ছেদে ক্ষোভের সূত্রপাত
সাম্প্রতিক এই আবাসন আন্দোলনের শুরু ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে মাদ্রিদের বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ভাড়া অনেক বেড়ে যাওয়ায় তা পরিশোধ করতে না পারার পর গত মাসে তাকে বাসা ছাড়তে হয়। এই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী আইন করার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়।
আন্দোলনকারীরা ভাড়া কমানো, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং তথাকথিত ‘ভালচার ফান্ড’ অর্থাৎ আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগকারী তহবিলগুলোর বাড়ি কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সামাজিক চাপের মধ্যে আবাসকাল যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেটির মালিক প্রতিষ্ঠান উরবাগেস্তিওনের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে কম ভাড়ায় আবার সেখানে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এই সমঝোতার পরও বিক্ষোভ বন্ধ হয়নি।
সংসদে সরকারের আবাসন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত
আবাসন সংকট কমানোর চেষ্টা হিসেবে সানচেজের সরকার শুক্রবার পার্লামেন্টে দুটি আলাদা ডিক্রি উপস্থাপন করে। প্রথম প্রস্তাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখা, ২০২৮ সালের আগে শেষ হওয়ার কথা থাকা ভাড়ার চুক্তি আরও দুই বছর বাড়ানো, পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত অ্যাপার্টমেন্টে কর বাড়ানো এবং বড় বিনিয়োগ তহবিলের আবাসিক সম্পত্তি কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে ভাড়ার চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থা রাখার কথা ছিল। ভাড়াটিয়া ইউনিয়নসহ বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান দাবি ছিল এই ব্যবস্থা।
তবে সংসদে প্রথম প্রস্তাবটি ১৭৮-১৭২ ভোটে এবং দ্বিতীয়টি ১৮৪-১৬৬ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়।
সরকারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (পিপি) ও ডানপন্থী ভক্স। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সানচেজ সরকারকে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। কিন্তু কাতালোনিয়ার মধ্য-ডানপন্থী স্বাধীনতাপন্থী দল জুন্টসও শেষ মুহূর্তে প্রস্তাব দুটির বিরোধিতা করায় সেগুলো পাস হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
মাদ্রিদে ব্যাপক বিক্ষোভ
শনিবার মাদ্রিদে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। কেউ কেউ স্লোগান দেন, ‘ভাড়াবাদের জন্য শান্তি থাকবে না’ এবং ‘ভবিষ্যৎ গড়তে পড়াশোনা করি, ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য নয়।’
অনেক বিক্ষোভকারী হাতে থাকা ঘরের চাবি ঝাঁকিয়ে স্লোগান দেন, ‘পুরো শহরের চাবি আমাদের হাতে।’ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পুয়ের্তা দেল সলেও কয়েক দিন ধরে আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।
এক বিক্ষোভকারী স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, তারা আনন্দ বা আরামের জন্য রাস্তায় নামেননি; নিজেদের বিশ্বাস ও দাবির প্রতি দৃঢ় অবস্থান থেকেই তারা আন্দোলনে এসেছেন।
২৬ বছর বয়সী গ্রন্থাগারকর্মী মার্কোস সাইন্স জানান, আগে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দুই বেডরুমের একটি ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করে থাকতেন এবং মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন মাদ্রিদে একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের ভাড়াই অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার ইউরোর বেশি।
তিনি বলেন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তা না হলে অনেককেই মাদ্রিদ ছেড়ে যেতে হবে।
ভ্যালেন্সিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
সব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল না। পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ায় কিছু বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে একটি রিয়েল এস্টেট সম্মেলন চলার সময় প্যালাউ দে লেস আর্টস রেইনা সোফিয়ার কাছে বিক্ষোভ হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড সরিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে কিছু ছুড়ে মারলে পুলিশ রাবার বুলেটসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই জানিয়েছে, ওই ঘটনায় নয়জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
মাদ্রিদেও ডানপন্থী একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর তিন সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন নাৎসি স্যালুট দেখিয়ে বিক্ষোভকারীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
বাড়ির ঘাটতি ৭ লাখ
স্পেনের আবাসন সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতি অন্যতম বড় কারণ। ব্যাংক অব স্পেনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নির্মাণ ও আবাসনের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কারণে দেশে প্রায় ৭ লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে।
এর পাশাপাশি বাড়ির দামও দ্রুত বাড়ছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে বাড়ির দাম ১২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান আইডিয়ালিস্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনে ভাড়ার খরচ ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। মাদ্রিদে এই বৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভাড়ার শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রতি বর্গমিটারে ভাড়া যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮০ ইউরো ও ২২ দশমিক ৭০ ইউরো।
সাধারণ ধর্মঘটের ডাক
আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন এখন শুধু ভাড়া কমানোর দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন সরকার প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোকে অপর্যাপ্ত মনে করলেও সংসদে সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হওয়াকে সংকট আরও বাড়ার কারণ হিসেবে দেখছে।
সংগঠনটি আবাসন সংকটের প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক চাপেও সানচেজ
আবাসন সংকট এখন স্পেনের রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছে। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সংখ্যালঘু জোট সরকারের অবস্থান নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে। স্প্যানিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নভেম্বরেই আগাম নির্বাচন হতে পারে বলে জল্পনা চলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকার সোশ্যালিস্ট পার্টি ও জুনিয়র জোটসঙ্গী সুমারকে নিয়ে গঠিত। সংসদে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে আবাসন সংকটের মতো জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সরকারকে অন্য দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আবাসন সংকট, বাড়তে থাকা ভাড়া ও বাড়ির দাম এবং সংসদে সরকারের সংস্কার প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়া—সব মিলিয়ে স্পেনে এখন রাজপথের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পাশাপাশি বাড়ছে।
এস এম/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬







