জাতীয়

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা সংসদে বললেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর-বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, অন্যায় ও অপশাসনের বিশাল পাহাড় ভেঙে একটি নতুন, সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সমাপনী বক্তব্যে তিনি দেশের সামগ্রিক চিত্র এবং দুর্নীতির গভীর ক্ষত তুলে ধরেছেন। লেখাটিতে এই বক্তব্যকে পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৬ বছর পার হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ ও সার্বভৌমত্বের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে সর্বগ্রাসী দুর্নীতিকে তুলে ধরা হয়েছে। গত দেড় দশকে পতিত ফ্যাসিবাদের সময়ে এই দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। দুর্নীতির এই দীর্ঘ ও ভয়াবহ প্রভাব সচিবালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। মেগা প্রকল্পের নামে অর্থ পাচার, ব্যাংক খাত খালি করে দেওয়া এবং প্রয়োজন না থাকা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পতিত সরকারের এই বিপুল লুণ্ঠনের কারণে তৈরি হওয়া বড় ঋণের বোঝা এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ যখন কোনো সরকারি সেবা নিতে যায়—যেমন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধন, ভূমি অফিসের মিউটেশন কিংবা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা—তখন প্রায় প্রতিটি ধাপেই তাকে ঘুষের মুখোমুখি হতে হয় বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি দফতরে টেবিলের নিচ দিয়ে সুবিধা না দিলে সাধারণ মানুষের ফাইল নড়ে না বলেও দাবি করা হয়েছে। এই ব্যাপক দুর্নীতির প্রভাব সরাসরি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রায় পড়েছে।

সমাজে দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়াবহ কিছু রূপ কয়েকটি নির্দিষ্ট অপরাধচক্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। মাদকের ভয়াল প্রভাব দেশের যুবসমাজকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি শুধু সামাজিক অবক্ষয়ই তৈরি করছে না, এর পেছনে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ পাচার ও প্রশাসনিক আশকারাও কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই মাদক চক্রের সঙ্গে সন্ত্রাসও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বারবার ব্যাহত করেছে। হাট-বাজার, পরিবহন খাত, ফুটপাত থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বিভিন্ন পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাধারণ ক্রেতার পকেট খালি করছে। একইভাবে দখলবাজির কারণে সরকারি জমি, নদী-নালা এমনকি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও রেহাই পায়নি বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ চুরির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল টেন্ডারবাজি বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ না রেখে ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ নেওয়া হতো এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে বলে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্য দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে কোটি টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি করার কারণে সৎ ও মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছেন, আর ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিরা পরে আরও বেশি উৎসাহে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে সুবিধাজনক পদে যাওয়ার জন্য চলা বদলি বাণিজ্য সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব নষ্ট করে অনৈতিকভাবে আয় বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দুর্নীতি শুধু বর্তমানকে কঠিন করে তোলে না, এটি দেশের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। মেধা ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। যোগ্যতার বদলে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার যে চর্চা ফ্যাসিবাদী আমলে তৈরি হয়েছিল, তা তরুণ সমাজকে চরম হতাশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। মেধাবীরা বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছেন এবং যারা দেশে থাকছেন তারাও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলে দাবি করা হয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিগত সরকার একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে সুবিধা দিতে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। অন্য দেশকে নির্বিঘ্নে সুবিধা দিতে গিয়ে জাতীয় সম্পদ ফেলে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকট শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি জীবন পর্যন্ত স্থবির করে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক সরকারপ্রধান এসেছেন। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন আপসহীন ও সাহসী বক্তব্য এর আগে কেবল একজন দিয়েছিলেন বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে—তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যকেও লেখাটিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রধান কাজ সংকট চিহ্নিত করে সাহসের সঙ্গে তা মোকাবিলার ঘোষণা দেওয়া—এবং প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। দেশপ্রেম, সততা, বিনয়, রাজনৈতিক সৌজন্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতার মাপকাঠিতে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে তাঁর সমকক্ষ বা বিকল্প নেতৃত্ব নেই—এমন মূল্যায়নও লেখাটিতে করা হয়েছে।

সংসদকে সব আলোচনা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনরুজ্জীবনের একটি লক্ষণ হিসেবে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে যেসব তরুণ ও সাধারণ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছেন, সেই বীর শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের একমাত্র উপায় হিসেবে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রনায়ক যুদ্ধের আহ্বান জানাতে পারেন, কিন্তু সেই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সৈনিকের মতো ভূমিকা রাখতে হবে বলেও লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিশেষে বলা হয়েছে, প্রশাসনের সব স্তরে জমে থাকা দুর্নীতির পাহাড় এক দিনে সরানো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছা ও সাহস থাকলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নেতৃত্ব ও নীতিগত অবস্থানের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন সব স্তরের মানুষের ঐকমত্য ও সক্রিয় সহযোগিতা। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানকে ধারণ করে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করতে পারলে বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর, আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

এস এম/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language