কাহবুব পাহাড়ে হুতিদের অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা, হামলা প্রতিহতের দাবি

সানা,১৭ সেপ্টেম্বর- ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগত কাহবুব পাহাড়কে ঘিরে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পাহাড়ি এলাকায় হুতিরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় সামরিক সূত্র জানিয়েছে।
কাহবুব পাহাড়শ্রেণির ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায়। কৌশলগত মায়ুন দ্বীপের কাছাকাছি হওয়ায় পাহাড়গুলোর সামরিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব এলাকায় হুতিদের অগ্রগতির পর কাহবুব পাহাড় নিয়ন্ত্রণের লড়াইও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
হুতিদের হামলা প্রতিহতের দাবি
কাহবুব ফ্রন্টে হুতিদের কয়েক দফা হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনী। তাদের ভাষ্য, পাহাড়ি এলাকায় আরও ভেতরে প্রবেশের উদ্দেশ্যে হুতিরা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে এবং বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা মোতায়েন করে হামলা চালায়।
সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর দাবি, এসব হামলায় হুতিদের কয়েকজন যোদ্ধা নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে। একই সঙ্গে হুতিদের ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম, যানবাহন ও বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
তাদের আরও দাবি, কাহবুব পাহাড়ের আকাশসীমায় উড়তে থাকা একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে।
তবে এসব হতাহত ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুপ্রবেশের চেষ্টাও প্রতিহতের দাবি
কাহবুব এলাকায় সংঘর্ষের পাশাপাশি আল-মুদারাবা ফ্রন্টেও হুতিদের একটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারপন্থী ন্যাশনাল শিল্ড বাহিনী।
বাহিনীটির ভাষ্য, সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের সহযোগিতায় তারা হুতিদের ওই অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। অভিযানে দুই হুতি যোদ্ধাকে আটক এবং আরও কয়েকজনকে আহত করার দাবি করেছে তারা।
ইয়েমেনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ন্যাশনাল শিল্ড বাহিনী ও সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডসহ বিভিন্ন সরকারপন্থী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর আগে হুতিদের অগ্রযাত্রার মুখে এসব বাহিনীকে মোচা ও বাব আল-মানদেব এলাকার বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই করতে দেখা গেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ কাহবুব পাহাড়?
কাহবুব পাহাড়ের গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। পাহাড়শ্রেণিটি বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। এখান থেকে প্রণালি ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকার ওপর নজরদারি করা সম্ভব।
একজন ইয়েমেনি সামরিক বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাহবুবের নিয়ন্ত্রণ শুধু স্থলভাগে অগ্রসর হওয়ার বিষয় নয়; এটি বাব আল-মানদেবের নৌ চলাচলের ওপর চাপ তৈরির একটি কৌশলগত অবস্থানও হতে পারে। পাহাড়ি অবস্থান হুতিদের মায়ুন দ্বীপ ও প্রণালির প্রবেশপথের কাছাকাছি সামরিক অবস্থানকে আরও সুরক্ষা দিতে পারে বলেও ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে কাহবুবের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের সামুদ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
বাব আল-মানদেব ঘিরে হুতিদের অগ্রগতি
কাহবুবকে ঘিরে লড়াই এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিরা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা মোখা বন্দর দখলের পর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে ধুবাব এবং কৌশলগত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মানদেব প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে এবং প্রণালির নৌপথকে দুটি অংশে ভাগ করেছে।
আল-জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হুতিদের পশ্চিম উপকূলীয় অগ্রগতি বাব আল-মানদেব এলাকায় তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে এত বড় উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিপুল জনবল ও সরবরাহ প্রয়োজন হওয়ায় তাদের জন্য নতুন সামরিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পাহাড়ি এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হুতিদের জন্য প্রতিরক্ষার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাহাড়ি ভূখণ্ডে অবস্থান নেওয়া তাদের উপকূলীয় অবস্থানকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারপন্থী বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতেও সহায়ক হতে পারে বলে সামরিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলেও প্রভাবের আশঙ্কা
বাব আল-মানদেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রণালির আশপাশে সামরিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের পশ্চিম উপকূলে অগ্রগতির কারণে বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। মায়ুন দ্বীপ ও প্রণালির আশপাশের এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, বিমা ব্যয় এবং বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সংঘাতের নতুন কেন্দ্র হতে পারে কাহবুব
ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাতের বিভিন্ন ফ্রন্টের মধ্যে কাহবুব এখন আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হুতিদের পশ্চিম উপকূলীয় অগ্রযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারপন্থী বাহিনী যদি কাহবুব ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো ধরে রাখতে পারে, তাহলে বাব আল-মানদেবের দিকে হুতিদের স্থলভিত্তিক অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, হুতিরা কাহবুব পাহাড়ে অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলে বাব আল-মানদেব ও মায়ুন দ্বীপের আশপাশে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও সুসংহত হতে পারে। ফলে কাহবুব পাহাড় ঘিরে লড়াই এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি ফ্রন্ট নয়; এটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে।
এস এম/ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬







