উত্তর আমেরিকা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী চাপে, কমছে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত

মার্কিন সামরিক বাহিনী

ওয়াশিংটন, ১৭ সেপ্টেম্বর- মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে চরম সংকটের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ইন্টারসেপ্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনী মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়েছে। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ, জটিল রসদ সরবরাহ এবং সামগ্রিক সামরিক প্রস্তুতির ঘাটতিসহ একাধিক সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে পেন্টাগন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন বাহিনীর এই মানসিক ও কাঠামোগত ক্লান্তি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাই ধসে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান তাদের সর্বাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর একাধিক সফল হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে এসব হামলা হওয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনী অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরানি সামরিক সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারার অভিযোগ তুলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনায় সুস্পষ্ট ঘাটতি ও দূরদর্শিতার চরম অভাব দেখা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলা মার্কিন বাহিনীর সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিরক্ষামূলক গোলাবারুদের সংকট, ক্রমবর্ধমান হতাহতের সংখ্যা, নৌঘাঁটি ও জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা, সৈন্যদের অনির্দিষ্টকালের জন্য মোতায়েন রাখা এবং বাহিনীর মনোবল কমে যাওয়া মার্কিন সামরিক প্রস্তুতিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পেন্টাগনের সামরিক বাজেটও এখন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে, যা এত দিন ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া আশাব্যঞ্জক বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন সামরিক সক্ষমতা স্থবির হয়ে পড়েছিল।

যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করাকে তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, বাস্তবে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীকে অভাবনীয় চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় এক মার্কিন কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসের সেই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে মনে করা হচ্ছিল ইরান খুব দ্রুত ভেঙে পড়বে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বিষয়টি মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি বজায় রাখা একেবারেই অসম্ভব। মার্কিন প্রশাসন ও যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে নানা দাবি করলেও বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ১৫টিরও বেশি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান সফল হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিস্থিতিকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম মেকোর রিশোন। পত্রিকাটির সম্পাদক রমি ইতজার লিখেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যে তথ্যগুলো গোপন করার চেষ্টা করেছিল এবং যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথ যেভাবে সত্য অস্বীকার করে আসছিলেন, সেসব চিত্র এখন পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান তাদের উন্নত মানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো অক্ষত রাখতে পেরেছে।

পেন্টাগনের ওয়াচডগের প্রথম আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে। খবরের সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাদের মজুতকে বিপজ্জনক মাত্রায় নামিয়ে এনেছে।

এ ধরনের বিধ্বংসী হামলার মুখে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের সামরিক সদস্য ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন বাহিনীর মেডিকেল ইভাকুয়েশন হেলিকপ্টারও প্রত্যাহার করতে হয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান কেন্দ্রে ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যাকে দেশটির ভারপ্রাপ্ত নৌসচিব হাং চাও সম্পূর্ণ ছারখার হয়ে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফলে ডিয়াগো গার্সিয়ার মাধ্যমে রসদ পাঠাতে গিয়ে পুনঃসরবরাহের সময়সীমা বেড়ে ১৪ থেকে ১৮ দিনে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখনো প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যাদের সেখান থেকে বের করে আনার স্পষ্ট কোনো কৌশল নেই। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সৈন্য নিহত এবং প্রায় ৮০০ জন আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন কর্মকর্তারা গোপনে কর্মকর্তা ও সামরিক সুবিধার সংখ্যা কমানোর কথা ভাবছেন। এ ছাড়া ওয়াচডগের মতে, ৫০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে এফ-১৫ই, কেসি-১৩৫, এএইচ-৬ হেলিকপ্টার ও বিপুল সংখ্যক এমকিউ-৯ ড্রোন রয়েছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, এফ-৩৫, এ-১০ এবং ই-৩-এর মতো মূল্যবান সামরিক বিমান ও ড্রোনও ধ্বংসের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

এস এম/ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language