চীনে নিখোঁজ মার্কিন গবেষক মিন জিন আটক, নিশ্চিত করল ওয়াশিংটন

ওয়াশিংটন, ১৫ সেপ্টেম্বর- তিন দিনব্যাপী একটি অ্যাকাডেমিক কর্মশালায় যোগ দিতে চীনে গিয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার পর মিয়ানমার বংশোদ্ভূত এক মার্কিন গবেষক বন্দি হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। আটক ওই গবেষকের নাম মিন জিন।
গত ৩ জুন চীনের ইউনান প্রদেশে পৌঁছানোর পরপরই তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে ৫ জুন গুয়াংজুতে থাকা মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল মিন জিনের পরিবারকে জানায়, চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জিনের পরিবার এই অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে দাবি করলেও বেইজিং জানিয়েছে, তাকে ‘আইনি বিধিনিষেধের’ আওতায় রাখা হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সরকারি স্বীকৃত একটি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে চীনে যাওয়া এই মার্কিন নাগরিককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলেছে চীনা গোয়েন্দা সংস্থা।
ঘটনার বিস্তারিত থেকে জানা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত একটি কর্মশালায় যোগ দিতে গত ৩ জুন চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের ‘৯৬৪০’ নম্বর ফ্লাইটে থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই থেকে চীনের কুমিংয়ের উদ্দেশে রওনা হন মিন জিন। কুমিং বিমানবন্দরে নামার পর তিনি তার পরিবার এবং তাকে আমন্ত্রণ জানানো চীনা অধ্যাপককে ‘জাস্ট ল্যান্ডেড ইন কুমিং’ লিখে একটি বার্তা পাঠান। কিন্তু এর পরপরই তার ফোন ও যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত হোটেলেও তিনি চেক-ইন করেননি। তার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে দেখা যায়, সেটি কুমিং বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে আননিংয়ের লিয়ানরান নামের একটি এলাকায় অবস্থান করছে। এর কিছুক্ষণ পর ডিভাইসটির লোকেশনও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরদিন মিন জিনের স্ত্রী সিলভিয়া জিন একটি চীনা নম্বর থেকে অপ্রত্যাশিত একটি ফোন কল পান। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি তাকে একটি ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক তদন্তের’ কথা জানান, যা চীনের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। সিলভিয়া জিন তার স্বামী আটক হয়েছেন কি না জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দেন। পরে মার্কিন কনস্যুলেটের হস্তক্ষেপে জানা যায়, মিন জিনকে চীনে একটি গোপন ও নজরদারির মধ্যে থাকা স্থানে আটক রাখা হয়েছে। দেশটির আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা বা গ্রেফতার দেখানোর আগে সর্বোচ্চ ছয় মাস এ ধরনের গোপন স্থানে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়।
মার্কিন কনস্যুলারের মাধ্যমে পরিবারের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিন জিনকে একটি ছোট, জানালাবিহীন অন্ধকার কক্ষে রাখা হয়েছে। সেখানে দিন-রাত সবসময় তীব্র আলো জ্বালিয়ে রাখা হয় এবং তিনি ২৪ ঘণ্টা প্রহরীদের নজরদারিতে থাকেন। তাকে বাইরে যাওয়ার বা সূর্যের আলো দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে ছয় ঘণ্টা, এমনকি কখনো তার চেয়েও বেশি সময় ধরে তাকে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দিনের বাকি সময় তিনি ধ্যানে (মেডিটেশন) কাটান। এখন পর্যন্ত তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বা কোনো চিঠি আদান-প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আটক হওয়ার পর থেকে মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তারা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে তিনবার তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। প্রতিবার মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়। চীনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কারণে তার মামলার আইনি বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা করা যায়নি। শারীরিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও হাঁটুর তীব্র ব্যথায় ভুগছেন বলে কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন মিন জিন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর মিন জিনের আটকের ঘটনাকে পুরোপুরি বেআইনি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, অতীতে মিয়ানমারে সামরিক শাসনবিরোধী ১৯৮৮ সালের ছাত্র আন্দোলনে মিন জিনের সক্রিয় ভূমিকা এবং পরে মার্কিন সরকারি অনুদানে তার পরিচালিত গবেষণাই চীনা গোয়েন্দাদের নজরদারির কারণ হতে পারে। বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন ভূকম্পনবিদ ইউলিন চেনের পর মিন জিন হলেন দ্বিতীয় কোনো আমেরিকান নাগরিক, যাকে চীনের মাটিতে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হিসেবে মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করেছে। ইউলিন চেনও ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে একই ধরনের গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে চীনে বন্দি রয়েছেন।
অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে থাকা চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা জানিয়েছেন, মিন জিনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ‘ফৌজদারি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে এবং তার মৌলিক আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে মিন জিনের পরিবারের দাবি, এর আগেও তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণার কাজে একাধিকবার চীনে গেছেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবরেও তিনি চীনা সরকার-সমর্থিত একটি অ্যাকাডেমিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাই এবারও আমন্ত্রণ গ্রহণের সময় তাদের মনে কোনো ধরনের আশঙ্কা বা সন্দেহ ছিল না। মিন জিনকে দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এখন বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
এস এম/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬







