দক্ষিণ এশিয়া

পাকিস্তানের জন্য সৌদি-হুথি সংঘাত বড় পরীক্ষা, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও রাখতে চায় ইসলামাবাদ

পাকিস্তানের জন্য সৌদি-হুথি সংঘাত বড় পরীক্ষা

ইসলামাবাদ,১২ সেপ্টেম্বর- এক বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। একই সময়ে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখে আসছে ইসলামাবাদ। তবে চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলন ও সৌদি বাহিনীর মধ্যে লড়াই শুরু হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য এই দ্বৈত ভূমিকা বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইসলামাবাদ আর কতদিন একই সঙ্গে দুই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটেরও এটি প্রথম বড় পরীক্ষা। ‘মক্কা জোট’ নামে পরিচিত এই জোটটি ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা একটি চুক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যবস্থার আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বছরের শুরুতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনায় হুথিদের তৈরি করা হুমকি ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। জুলাই মাসে দেশটির দুই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এতে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দীর্ঘদিনের সংকটের পর ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব চুক্তির পাশাপাশি বা পরে প্রায়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়।

তবে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে আসা তেল-গ্যাস সরবরাহের ওপরও পাকিস্তান অনেকটাই নির্ভরশীল। ইরান ও হুথিরা এসব পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তা তারা এরই মধ্যে দেখিয়েছে। তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি তেহরানকে ক্ষুব্ধ না করাও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরান ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যে অতীতেও উত্তেজনা অনেক সময় প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। দুই বছর আগে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে সীমান্তের কাছে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আস্তানায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর জবাবে ইসলামাবাদও পাল্টা হামলা চালিয়েছিল। তখন উত্তেজনা নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করলেও পরে তা দ্রুত কমে আসে।

এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই পাকিস্তান তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান ও ইরানের একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স বুধবার জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব ইরানকে একটি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। এতে ইয়েমেনে হুথি মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তেহরানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। সেখানে সব ক্ষেত্রে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও চালু করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, সৌদি-হুথি সংঘাতে পাকিস্তান সতর্ক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কারণ এর সঙ্গে পাকিস্তানের বড় ধরনের নিজস্ব স্বার্থ জড়িত। তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।

বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান জানান, হুথিদের হামলার জবাবে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এখনো আলোচনায় নেই। মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে খান বলেন, ইরানের নেতৃত্ব সবসময় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। পাকিস্তান সবসময় উত্তেজনা বাড়ানোর বিরোধিতা করে আসছে এবং সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

প্রকাশ্যে ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, তারা এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কোনো হুমকি হিসেবে দেখছেন না। তবে পর্দার আড়ালের পরিস্থিতি ভিন্ন। আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন ইরানের তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পাকিস্তানের হয়তো ভালো উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বা কাতারের মতো দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর অভিজ্ঞতা তাদের নেই।

ইসলামাবাদ এখন নিজেদের ওপর নেওয়া এই ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকার পরিধি বুঝতে পেরে কৌশল নতুন করে ভাবছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার পর কুয়েতও প্রায় একই ধরনের একটি চুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে ইরানের হামলার ঝুঁকিতে থাকা আরেকটি উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে সতর্ক হয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সেই আলোচনা সীমিত করে আনেন।

এর বদলে গত মাসে ইসলামাবাদে দুই দেশ প্রশিক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে একটি সীমিত পরিসরের প্রটোকল স্বাক্ষর করে। তবে এতে কুয়েতের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খান জানান, পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের বৃহত্তর জোটে আপাতত নতুন কোনো সদস্য যুক্ত করার পরিকল্পনা নেই। চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ প্রশ্ন তুলেছেন, তেহরানের কাছে ইসলামাবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আসলেই যতটা শক্তিশালী বলে মনে করা হতো, তা ছিল কি না।

তিনি বলেন, কাতার বা ওমান মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে যে ধরনের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারত, পাকিস্তানের তা নেই। তার মতে, ইসলামাবাদের এই বিশেষ ভূমিকার পেছনে তাদের নিজেদের কূটনৈতিক শক্তির চেয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যকার ‘ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক’ বেশি ভূমিকা রেখেছে।

ক্রিপ্টো মুদ্রা সংক্রান্ত চুক্তি, বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতার পর ট্রাম্প একাধিকবার মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেকের মতে, এর কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকার ওপর এখনই কোনো চূড়ান্ত বা মারাত্মক আঘাত নাও আসতে পারে।

পাকিস্তান-ইরান সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলেন, রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণেই তেহরান ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে। তার মতে, এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান এমনভাবে বার্তা আদান-প্রদান করতে পারে, যা কোনো সত্যিকারের নিরপেক্ষ পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর এই বিশেষ সুবিধার ওপরই রিয়াদ ও ওয়াশিংটন ভরসা করে, যখন তারা ইসলামাবাদের মাধ্যমে বার্তা পাঠায়।

তবে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে এই হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে।

বোখারি বলেন, বার্তা পৌঁছে দেওয়া বা সেই বার্তার ধরন ঠিক করা এক বিষয়, আর সক্রিয় বিমান প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর ফলে পাকিস্তান শুধু সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ না থেকে সরাসরি যুদ্ধরত পক্ষ হয়ে যেতে পারে। সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর অধিকারী পাকিস্তান আগের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে এরই মধ্যে হাজার হাজার সেনা ও এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। ভারতের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তে সেনা মোতায়েন এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর কারণে একই ধরনের নিশ্চয়তা পেতে আগ্রহী অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দাবি সামলাতে পাকিস্তান এখন কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।

বোখারি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী এরই মধ্যে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস এম/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language