সম্পাদকের পাতা

উবার: একটি অ্যাপের হাত ধরে কীভাবে বদলে গেল পৃথিবীর চলাচল

নজরুল মিন্টো

একসময় শহরের রাস্তায় ট্যাক্সি ডাকার আলাদা এক দৃশ্য ছিল। বৃষ্টি নামলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ হাত তুলত। কেউ অফিস থেকে ফিরছে, কেউ বিমানবন্দরে যাবে, কেউ ঘরে ফিরতে চায়। ট্যাক্সির ছাদে আলো জ্বলছে কি না, চালক থামবেন কি না, মিটার চালু হবে কি না, পথ কতটা ঘুরে যাবে, ভাড়া শেষে কত দাঁড়াবে, সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের অনিশ্চয়তা। মিটার ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু সব শহরে, সব সময়ে, সব যাত্রীর জন্য সেটি নিশ্চিন্ততার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি।

সেই চেনা অভ্যাসের ভেতর একদিন ঢুকে পড়ল একটি ছোট্ট অ্যাপ: উবার। উবার হলো অ্যাপভিত্তিক রাইড সার্ভিস, যেখানে যাত্রী অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ডাকেন, চালক সেই অনুরোধ গ্রহণ করেন, আর পুরো যাত্রা পরিচালিত হয় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে। ট্যাক্সির অনিশ্চয়তার জায়গায় উবার নিয়ে আসে সময়, ভাড়া ও যাত্রাপথ সম্পর্কে আগাম ধারণার এক নতুন অভিজ্ঞতা।

উবারের জন্ম হয়েছিল এক সাধারণ অসুবিধা থেকে। ২০০৮ সালের শীতে প্যারিসে LeWeb সম্মেলনে গ্যারেট ক্যাম্প ও ট্রাভিস কালানিকের মধ্যে ট্যাক্সি পাওয়া নিয়ে কথা হয়। শহরে গাড়ি আছে, যাত্রী আছে, চালক আছে, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের মিলিয়ে দেওয়ার সহজ ব্যবস্থা নেই। এই ভাবনা থেকেই আসে স্মার্টফোন অ্যাপে গাড়ি ডাকার ধারণা। ২০১০ সালের ৩১ মে সান ফ্রান্সিসকোতে উবারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। একটি শহরের ট্যাক্সি সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে সেখান থেকেই জন্ম নেয় আজকের এই বৈশ্বিক ব্যবসা।

শুরুতে উবার ছিল মূলত কালো বিলাসবহুল গাড়ির সেবা। তখন কেউ ভাবেনি, এই ধারণা একদিন বিশ্বের বড় বড় শহরের পরিবহন মানচিত্র পাল্টে দেবে। কিন্তু উবারের শক্তি ছিল তার সহজতায়। যাত্রী গাড়ি চাইছেন, চালক আয় করতে চাইছেন, আর মাঝখানে একটি অ্যাপ দুই পক্ষকে যুক্ত করে দিচ্ছে। এই সহজ ব্যবস্থা দ্রুত শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পরে আসে UberX, যা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ভাড়া নিয়ে আসে।

আজকের উবার আর শুধু যাত্রী বহনের অ্যাপ নয়। শেয়ারড রাইড, প্রিমিয়াম গাড়ি, আগে থেকে গাড়ি বুক করার সুবিধা, বিমানবন্দর যাত্রা এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণের ব্যবস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। Uber Eats খাবার পৌঁছে দেয়, অনেক জায়গায় গ্রোসারি ও প্রয়োজনীয় পণ্যও ঘরে পৌঁছে দেয়। Uber Freight পণ্য পরিবহনের জন্য শিপার ও ক্যারিয়ারকে যুক্ত করে। Uber Health রোগী বা স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়। Uber for Business বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী, অতিথি বা গ্রাহকের যাতায়াত ব্যবস্থায় কাজে লাগে। কোথাও কোথাও উবার পাবলিক ট্রানজিট, বাইক ও স্কুটারের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

উবারের বিস্তার বোঝার জন্য কয়েকটি সংখ্যা যথেষ্ট। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ছিল ৭০টির বেশি দেশে এবং ১৫ হাজারের বেশি শহরে। নিজস্ব কর্মী ছিল প্রায় ৩৪ হাজার। গ্রস বুকিংস ছিল ১৯৩.৪৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে উবার জানায়, তাদের প্ল্যাটফর্মে চালক ও কুরিয়ারের সংখ্যা ১০ মিলিয়নের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। তাদের কেউ পূর্ণকালীন চালক, কেউ খণ্ডকালীন, কেউ পড়াশোনার ফাঁকে ডেলিভারি দেন, কেউ নতুন দেশে এসে প্রথম আয়ের পথ খুঁজে পান।

উবারের দেখানো পথ ধরে একে একে আসে আরও অনেক অ্যাপভিত্তিক যাতায়াত ও ডেলিভারি সেবা। তবে পৃথিবীর সব দেশে উবার নেই। যেখানে আছে, সেখানেও সব সময় একা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় Lyft বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় Grab শক্তিশালী নাম; তারা আট দেশে ৯০০টির বেশি শহরে রাইড, খাবার, গ্রোসারি, প্যাকেজ, পেমেন্ট ও আর্থিক সেবা দেয়। ইউরোপ ও আফ্রিকার বহু দেশে Bolt রাইড, স্কুটার, ই বাইক, কারশেয়ারিং ও খাবার ডেলিভারির মাধ্যমে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও পাকিস্তানের বাজারে Careem পরিচিত নাম। চীনে DiDi শক্তিশালী। ফলে উবারকে বুঝতে হলে শুধু একটি কোম্পানিকে দেখা যথেষ্ট নয়; দেখতে হয় পুরো অ্যাপভিত্তিক যাতায়াত ও ডেলিভারি অর্থনীতির মানচিত্র।

উবারের সামনে এখন আরেকটি বড় দরজা খুলছে। সেটি হলো স্বয়ংচালিত গাড়ি। একসময় যাত্রীর অনুরোধ গ্রহণ করতেন একজন চালক; আগামী দিনে সেই জায়গায় আসবে চালকবিহীন গাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শহরে Uber অ্যাপের মাধ্যমে স্বয়ংচালিত গাড়ির যাত্রা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আরও কিছু শহরে পরীক্ষামূলক ও পরিকল্পিত সেবা এগোচ্ছে।

উবারের গল্প আধুনিক শহরের বদলে যাওয়ার গল্প। এটি সময় বাঁচানোর গল্প। এটি যাত্রীর সুবিধার গল্প, আবার চালকের আয়ের গল্পও। এটি রেস্টুরেন্টের নতুন গ্রাহক পাওয়ার গল্পও। একটি ছোট্ট অ্যাপ দেখিয়েছে, পৃথিবী বদলাতে বিশাল কারখানা লাগে না; লাগে কেবল একটি ধারণা।

তথ্যসূত্র:
Uber Newsroom
Reuters
Associated Press


Back to top button