মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের তেলের ছায়া বহর: নেপথ্যের গোপন কৌশল

তেহরান, ২৯ জুলাই – ইরানের তেল রফতানি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ ও দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তেহরান অত্যন্ত সুকৌশলে তেল পরিবহনের জন্য একটি গোপন ও জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বজুড়ে ছায়া বহর বা শ্যাডো ফ্লিট নামে পরিচিত।
মূলত পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বিশালকার ট্যাংকার দিয়ে তৈরি এই বহরটি আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পৌঁছে দিচ্ছে। এই ছায়া বহরের কার্যক্রম অত্যন্ত রহস্যজনক। সমুদ্রপথে নজরদারি এড়াতে এই জাহাজগুলো প্রায়ই তাদের স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তি বন্ধ রাখে।
অনেক সময় ভুল অবস্থান সম্প্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। কর ফাঁকি ও শিথিল আইনি ব্যবস্থার সুযোগ নিতে জাহাজগুলো বারমুডা, লাইবেরিয়া, পানামা বা মার্শাল আইল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর পতাকা ব্যবহার করে। সামুদ্রিক পরিভাষায় একে ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স বলা হয়।
এসব জাহাজের মালিকানা সাধারণত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বা বিভিন্ন বিদেশি উদ্যোক্তাদের আড়ালে গোপন রাখা হয়। মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে কার্গোর প্রকৃত উৎস বদলে দিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যস্থলে পাঠানো হয়।
জাতিসংঘের সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ইরানের এই বাণিজ্য আন্তর্জাতিক আইনে পুরোপুরি অবৈধ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এই কাজে অংশ নিতে ভয় পায়। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকেই তেহরানের বিকল্প পথ হিসেবে ছায়া বহরের উদ্ভব হয়েছে।
বর্তমানে ইরানি তেলের প্রধান গন্তব্য হলো চীন। বেইজিং সরকারিভাবে সরাসরি আমদানির কথা স্বীকার না করলেও মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার তেল হিসেবে তা নথিবদ্ধ করে। বিশেষ করে চীনের শানডং প্রদেশের ছোট ছোট বেসরকারি শোধনাগার বা টিপট রিফাইনারিগুলো মূল্যছাড়ে এবং চীনা মুদ্রা ইউয়ানে বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল কেনে।
তবে এই ছায়া বহরের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। অধিকাংশ জাহাজ ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরনো হওয়ায় তেল লিকের মাধ্যমে সমুদ্র দূষণের শঙ্কা থাকে।
সিগন্যাল বন্ধ রেখে চলাচলের কারণে প্রায়ই নৌ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালে চীনের উপকূলে ইরানি সানিচি ট্যাংকারের দুর্ঘটনার বিষয়টি এর বড় প্রমাণ। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা এই বহর নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা বাড়ালেও চীনের অসহযোগিতা ও ভূ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই সংকট নিরসন কঠিন হয়ে পড়েছে।
এস এম/ ২৯ জুলাই ২০২৬









