ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের বিশাল বাঁধ নির্মাণ: ভারতের উদ্বেগ তুঙ্গে

বেইজিং, ১৮ জুন – তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেছে চীন। ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির নিরাপত্তা ও পরিবেশগত উদ্বেগ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য এবং উপগ্রহ থেকে পাওয়া চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, গত কয়েক মাসে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ অভাবনীয় গতিতে এগিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরেই ভারত সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলোর ওপর চীনের এ ধরনের বিশালাকার প্রকল্প নিয়ে তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে আসছে।
ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বতে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এটি আসামে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে প্রবাহিত হয়। এই নদীটির ওপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি নির্ভরশীল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ভারত সরকার এই মেগা প্রকল্পের ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি রাখছে। তিব্বতে চীনের অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় এটিকে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, নদীর মূল প্রবাহে এমন বিশাল আকারের বাঁধ নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এর ফলে পলি পরিবহনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে যা মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেবে। এছাড়া পরিবেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং ভাটির অঞ্চলে বন্যার ধরণ পরিবর্তনের মতো চরম ঝুঁকির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে উদ্বেগের কারণ শুধু পরিবেশগত নয়, এর পেছনে গভীর কৌশলগত দিকও রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উজানে এই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে চীন ভবিষ্যতে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধের ক্ষেত্রে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হাতে পাবে।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এতে ভাটির দেশগুলোর কোনো ক্ষতি হবে না। তবে ভারত এই আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। গত বছর ভারতের পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার এই মেগা বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৮৬ সালে প্রথম এই প্রকল্পের তথ্য সামনে এসেছিল এবং তখন থেকেই চীন এর প্রস্তুতিমূলক কাজ চালিয়ে আসছিল।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের সব ধরণের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ওপর নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে। ভাটির অঞ্চলের ভারতীয় নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে সব ধরণের সংশোধনমূলক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভারত সরকার বারবার চীনের কাছে নিজেদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, উজানের কোনো কর্মকাণ্ড যেন ভাটির দেশের স্বার্থের পরিপন্থী না হয়। ২০০৬ সালে গঠিত দুই দেশের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে এই আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এনএন/ ১৮ জুন ২০২৬









