আগামী বছর থেকেই যুক্ত হচ্ছে ৪টি নতুন বই, শিক্ষার দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র ফাঁসের বড় ঘোষণা!

ঢাকা, ৮ জুন – বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিশাল ও আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিল নতুন সরকার। মুখস্থ বিদ্যার চিরাচরিত গণ্ডি এবং বিগত কারিকুলামের সব বিতর্ককে পেছনে ফেলে ২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যক্রম (Curriculum) চালু হতে যাচ্ছে। তবে সেই চূড়ান্ত পরিবর্তনের আগেই, আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকেই চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ৪টি পাঠ্যবই!
আজ সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে সরকারের প্রথম তিন মাসের কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এই মেগা প্ল্যান, নতুন বইয়ের তালিকা এবং বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে মন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির সব খতিয়ান নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।
আগামী বছরই যে ৪টি নতুন বই আসছে আপনার সন্তানের হাতে
উপদেষ্টা মাহদী আমিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের আমলে দেশের শিক্ষা কাঠামোর যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তা রাতারাতি এক বছরে ঠিক করা সম্ভব নয়। তবে তরুণ প্রজন্মের মেধার সঠিক বিকাশের জন্য পরিমার্জনের পাশাপাশি আগামী বছর থেকেই ৪টি নতুন বিষয় রূপরেখার ভেতরে যোগ করা হচ্ছে:
চতুর্থ শ্রেণি থেকে: যুক্ত হচ্ছে দুটি নতুন বই—’ক্রীড়া’ এবং ‘সংস্কৃতি’। শিশুদের শারীরিক গঠন ও মানসিক বিকাশের জন্য এই দুটি বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে: এখানেও যুক্ত হচ্ছে দুটি নতুন বই। একটি হলো ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’, যা শিক্ষার্থীদের একদম ছোটবেলা থেকেই কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে সাহায্য করবে। অন্যটি হলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় ‘লার্নিং ওউইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সাথে শিক্ষা)।
নীতি ও নৈতিকতার পাঠ: ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নীতি ও সুনাগরিকত্বের পাঠ দেওয়া হবে। এর জন্য শিক্ষকদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
তৃতীয় ভাষার সংযোজন: বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই এবার নতুন করে একটি ‘তৃতীয় ভাষা’ শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যার একটি বড় অধ্যায় বইয়ে যুক্ত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, “একটি পুরো কারিকুলাম পরিবর্তন করা তিন মাসে সম্ভব নয়। আমরা কাজ শুরু করেছি, ২০২৮ সালে গিয়ে আপনারা পূর্ণাঙ্গ নতুন রূপরেখা দেখতে পাবেন। তবে এর আগেই পরিমার্জন করে ২০২৭ সালে এই ৪টি নতুন বই প্রবর্তন করা হচ্ছে।”
শিক্ষার মেগা প্রজেক্ট: “১ শিক্ষক ১ ট্যাব” ও বাজেটের সুখবর
বিগত সরকারের আমলে ২৬ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের আইসিটি প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথা জানান:
১৪ লাখ ট্যাব বিতরণ: দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষকদের জন্য এবার ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার জন্য প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব প্রয়োজন হবে।
বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষা খাতে আগামী অর্থবছরে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ থাকছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, প্রধানমন্ত্রী এই বাজেট ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আসছে শিক্ষার দুর্নীতির ‘শ্বেতপত্র’ ও টিআইবি প্রসঙ্গে মন্ত্রীর ক্ষোভ
বিগত সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কী পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের ১৮০ দিনের জরুরি কর্মসূচি শেষ হলেই আমরা কমিটি করব এবং বিগত সরকারের শিক্ষা খাতের সব দুর্নীতির খতিয়ান নিয়ে একটি ‘শ্বেতপত্র’ (White Paper) প্রকাশ করব।”
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে যে, বর্তমান সরকারও নাকি দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ দিচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন সরাসরি বলেন, “আপনি টিআইবির রিপোর্ট নিয়ে টিআইবিকে জিজ্ঞাসা করুন, আমি কোনো উত্তর দিতে রাজি নই। টিআইবির কাজ টিআইবি করবে, আমার কাজ আমি করব। এটা নবনির্বাচিত সরকার, তারা জানবে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করবে? সেটা আমাদের একান্ত বিষয়। টিআইবির এমন কোনো রিপোর্ট দেওয়ার সময় এখনো হয়নি, আমরা শুধু যাত্রা শুরু করেছি।”
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এদেশের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সবসময়ই এক ধরনের উদ্বেগের মধ্যে রাখে। তবে নতুন সরকারের এই ‘কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-এর মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো যদি সত্যিই মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের নতুন প্রজন্মের মেধা বিকাশে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে শিক্ষার পেছনে হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের শ্বেতপত্র দেখার অপেক্ষাতেও থাকবে দেশের মানুষ।
এনএন/ ৮ জুন ২০২৬









