উত্তর আমেরিকা

ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাবে না, গ্যারান্টি পেয়েছি— ট্রাম্পের বিস্ফোরক দাবি; প্রত্যাখ্যান তেহরানের

ওয়াশিংটন, ৩১ মে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও বড় গ্যারান্টি তিনি তেহরানের কাছ থেকে পেয়েছেন। গতকাল শনিবার (৩০ মে) রাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজে (Fox News) প্রচারিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকারটি অন্য কোনো পেশাদার সাংবাদিক নেননি; এটি নিয়েছেন তাঁর পুত্রবধূ লারা ট্রাম্প (লারা ট্রাম্প হলেন ট্রাম্পের তৃতীয় সন্তান এরিক ট্রাম্পের স্ত্রী)। লারার নিজস্ব একটি পডকাস্ট শো’তে অতিথি হিসেবে এসে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “ইরান যেন কখনো কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে—তেমন একটি গ্যারান্টি আমি শুরু থেকেই চাইছিলাম। আর চমৎকার ব্যাপার হলো, তারা শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে রাজি হয়েছে। বিষয়টি সত্যিই খুব আকর্ষণীয়।”

তবে একই সাথে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তিনি মোটেও তাড়াহুড়ো করছেন না। তিনি বলেন, “আমার কোনো তাড়া নেই। আমরা ধীরস্থিরভাবে এগোচ্ছি, তবে নিশ্চিতভাবেই আমরা যা চাচ্ছি তা-ই পাচ্ছি। আর যদি শেষ পর্যন্ত আমরা যা চাই তা না পাই, তবে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে (সামরিক পন্থায়) এর শেষ করব।” মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানের কাছে আরও কিছু ‘কঠোর শর্ত’ সম্বলিত একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে এই গ্যারান্টি পাওয়ার দাবি করলেও ইরানের সরকারি মহলে বা দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ট্রাম্পের এই দাবিকে একপ্রকার প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় দেশটির প্রধান পরমাণু আলোচনাকারী ও সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ (Mohammad Bagher Ghalibaf) সরাসরি বলেছেন, “ইরানি জনগণের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তিতে অনুমোদন দেব না। ইরানি প্রতিনিধি দল শত্রুর মুখের কথা কিংবা তাদের কোনো ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না।”

ইরানি গণমাধ্যমগুলোর দাবি, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের যে ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) ডলারের তহবিল ফ্রিজ বা আটকে রেখেছে, সেই অর্থ শর্তহীনভাবে অবমুক্ত করলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ মজুত ধ্বংস করার যে দাবি করে আসছে, তাকেও ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে তীব্র বৈশ্বিক উত্তেজনা চলছে। পশ্চিমাদের দাবি, ইরান শান্তির উদ্দেশ্যে পরমাণু গবেষণার আড়ালে মূলত পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে।

এই টানাপোড়েনের জের ধরে চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। টানা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গত এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি চললেও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ এবং খনি অপসারণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য সেই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজাবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

এনএন/ ৩১ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language