জাতীয়

অন্তর্বর্তী সরকারে প্রভাবশালী কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল: সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন

ঢাকা, ২৫ মে – দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্দরমহলের এক চরম ও নজিরবিহীন বিস্ফোরক সত্য ফাঁস করলেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো আসলে পুরো উপদেষ্টা পরিষদ নিত না; বরং পর্দার আড়ালে থাকা সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী ও বিশেষ সিন্ডিকেট বা ‘কিচেন কেবিনেট’ পুরো সরকার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত!

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া বিশেষ ও একচেটিয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক এই শীর্ষ কূটনীতিক সরকারের ভেতরের এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, যা নিয়ে এই মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানান, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই ‘কিচেন কেবিনেট’-এর সদস্যদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কম থাকা সত্ত্বেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রশ্রয় বা আশীর্বাদ থাকায় তাদের মতামতকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।

পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “আমি নিজে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে তাদের একটি বৈঠকে একবার উপস্থিত হয়েছিলাম। পরে আমি নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে, প্রতি মঙ্গলবার তারা নিয়মিত এই গোপন বৈঠকে বসতেন। সরকারের ভেতরে যে সব বড় সিদ্ধান্ত আদতে এই বিশেষ কয়েকজন মানুষই নিচ্ছেন, এমন কথাবার্তা উপদেষ্টা হিসেবে আমার কানেও প্রতিনিয়ত আসত।”

সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন নিজের গভীর হতাশা ও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার পরও অনেক বড় বড় এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হতো। এই অদৃশ্য কিচেন কেবিনেটের ক্রমাগত হস্তক্ষেপ এবং নিজের মন্ত্রণালয়ের ওপর একাধিক বাইরের উপদেষ্টার পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি চরম বিরক্ত ও সংক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

তিনি স্বীকার করেন, “নিজের প্রত্যাশার একটা বড় অংশই যখন পূরণ হচ্ছিল না, তখন এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বাঁচতে আমি ৩ বার পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আমাকে অনুরোধ করা হয় যে, এই মুহূর্তে আপনার মতো সিনিয়র মানুষের হুট করে চলে যাওয়া সরকারের জন্য চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। মূলত সরকারের সেই অস্বস্তির কথা ভেবেই আমি তখন অনুরোধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম।”

সবচেয়ে বড় বোমাটি তিনি ফাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া এক বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি সই করে।

সেটির সমালোচনা করে সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমি স্পষ্ট করে বলছি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চুক্তির সাথে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না! এর পেছনে সরাসরি কলকাঠি নেড়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। যদি কোনো অদৃশ্য বা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা না থেকে থাকত, তবে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সই করার বিষয়টি একটি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ও যথাযথ ছিল।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ‘ডিপ স্টেট’ বা কোনো অদৃশ্য পরাশক্তির সক্রিয়তা ছিল কি-না, এমন এক গভীর প্রশ্নে এই অভিজ্ঞ কূটনীতিকের জবাব ছিল বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “ডিপ স্টেট পৃথিবীর সব বড় বড় ঘটনার সাথেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকে। তবে তারা কখনো স্রোতের বিপরীতে হাঁটে না। তারা জনস্রোতের সাথে মিশে যায় এবং পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে ম্যানিপুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।”

সাবেক এই উপদেষ্টা জানান, ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, সেটি যে আসলে কূটনৈতিক প্রথা রক্ষার বাইরে কোনো বাস্তব কাজে আসবে না, তা তিনি ভালো করেই জানতেন। কেবল কূটনৈতিক প্রটোকল বা নিয়মরক্ষার খাতিরেই তখন সেই তৎপরতা চালাতে হয়েছিল।

আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং গণঅসন্তোষের মুখে থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তৌহিদ হোসেন এক ভিন্নধর্মী ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না যে আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতি থেকে একেবারে চিরতরে শেষ বা আউট হয়ে যাবে। আমাদের দেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব একটা দীর্ঘ নয়, তারা দ্রুত অনেক বড় বড় অন্যায় ভুলে যায়। তাই আমার দৃঢ় অনুমান—তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে নিশ্চিতভাবেই অংশ নেবে।”

নতুন সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তৌহিদ হোসেন। তবে একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি মনে করেন, বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে টিকিয়ে থাকতে হলে এবং রাষ্ট্রকে সফলভাবে চালাতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো বিশ্বমঞ্চের তিনটি পরাশক্তির সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ।

এনএন/ ২৫ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language