দেশে হামে শিশুমৃত্যু ও টিকাদান পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য: সংকটের মাঝেও “অগ্রগতির” দাবি

ঢাকা, ০৩ মে – দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গজনিত কারণে প্রায় তিনশ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হলেও সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু ইতোমধ্যে হামের টিকার আওতায় এসেছে এবং টিকাদান কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং টিকা সরবরাহে কোনো সংকট নেই। তাঁর ভাষায়, “লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ শিশু ইতোমধ্যে টিকার আওতায় এসেছে। এখানে কোনো ঘাটতি বা দুর্বলতা নেই।”
তিনি আরও দাবি করেন, টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর হার কমে আসছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, টিকা গ্রহণের পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এর পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আর দুই-চার দিনের ভেতরে আমরা ১০০ শতাংশ লক্ষ্য কভার করতে পারব। আমাদের কোনো স্টক ঘাটতি নেই।”
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এদিন হামে আক্রান্ত হয়ে এবং উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে, বাকি নয়জনের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ দেখা গেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫০ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে—যা পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের মৃত্যুর ধারা সাধারণত টিকাদানের ঘাটতি, সময়মতো শনাক্তকরণে দেরি এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রান্তিক পর্যায়ের দুর্বল ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়। যদিও সরকার দ্রুত টিকাদান বাড়ানোর কথা বলছে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ডিসি সম্মেলনের প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জেলার প্রশাসকদের স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার
* মাতৃদুগ্ধপান (ব্রেস্টফিডিং) বৃদ্ধি
* জলাতঙ্ক ও সাপে কাটার ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা
* অবৈধ ক্লিনিক ও ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সহযোগিতা ছাড়া জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো সফল করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮১ শতাংশ টিকাদান কাভারেজ জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি এখনো “হের্ড ইমিউনিটি” অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বাকি ১৯ শতাংশ শিশু ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাচ্ছে, যাদের মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া টিকাদান কর্মসূচির গতি, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের দ্রুত টিকাদান সম্পন্ন করার ঘোষণা যেমন আশার কথা, তেমনি বাস্তব মৃত্যুর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রয়োজন শুধু ঘোষণা নয়—কার্যকর মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এনএন/ ০৩ মে ২০২৬









