যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে আতঙ্কের মাঝে ঈদুল ফিতর ও নওরোজ উদযাপনের প্রস্তুতি

তেহরান, ২০ মার্চ – শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত ইরানে আগামীকাল ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। এর আগে ২০ মার্চ পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হিসেবে পালিত হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবারের পরদিন থেকে দেশে ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি শুরু হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে শুক্রবার হবে বরকতময় রমজান মাসের ৩০তম দিন এবং এরপরই ছুটির সূচনা হবে। অন্যদিকে ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলি আল সিস্তানিও পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করেছেন। ইরান চলমান এই সংঘাতকে রমজান যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। চলতি মাসেই মোজতবা খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়।
তিনি তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের শুরুতে এক বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কাকতালীয়ভাবে এ বছর পবিত্র রমজানের শেষ দিনেই পালিত হবে ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ। অতীতে ইরানিরা ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নওরোজ উদযাপনের প্রস্তুতি নিত। তেহরানের কাছাকাছি দামাভান্দ এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব বাসিন্দা মিনা জানান, আগে এই দিনগুলোতে তারা ঘর পরিষ্কার, নতুন পোশাক এবং মিষ্টি কেনাকাটায় অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে উল্লেখ করেন। মিনার মতে, এ বছর প্রতিটি দিনকে দীর্ঘ মনে হচ্ছে এবং সময় যেন থমকে গেছে।
নওরোজ শব্দের অর্থ হলো নতুন দিন। তিন হাজার বছরের বেশি পুরোনো এই উৎসবটি মূলত বসন্তের আগমন, প্রকৃতির পুনর্জাগরণ এবং নতুন বছরের সূচনার প্রতীক। কিন্তু এ বছরের ২০ মার্চের নওরোজ অনেক ইরানির জন্যই যুদ্ধের আবহে প্রথম নববর্ষ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান জানিয়েছে, চলমান এসব হামলায় এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১১৪ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪ জন সাধারণ নাগরিক এবং অন্তত ২০৭ জন শিশু রয়েছে। জবাবে তেহরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। মিনার ছেলে আমির জানান, এবারের নওরোজ তাদের কাছে একেবারেই অন্যরকম। যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। তিনি দেশের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। আমিরের আশঙ্কা, এই অবস্থা চলতে থাকলে ইরানে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি চান না এটিই তাদের জীবনের শেষ নওরোজ হোক।
নওরোজ ইরানিদের কাছে কেবল একটি উৎসব নয়, এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পার্সিয়ান, পারসি, কুর্দি, আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, তাজিক, কাজাখ এবং উজবেকসহ নানা জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব রীতির মাধ্যমে এই উৎসব পালন করে। এর আগে ১৯৮০ এর দশকে ইরাকের সঙ্গে আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের সময় ইরানিরা সর্বশেষ যুদ্ধকালীন নওরোজ উদযাপন করেছিল। নওরোজের আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার একটি বিশেষ প্রথা রয়েছে, যার মাধ্যমে পুরোনো বছরের সব দুঃখ ও কষ্ট দূর করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।
মিনা অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বলেন, নতুন বছর শুরু হলে টেলিভিশনে উৎসবের ঘোষণার পাশাপাশি মিসাইল ও ড্রোনের শব্দও শোনা যাবে কি না তা তিনি জানেন না। নওরোজের দুই সপ্তাহের ছুটিতে সাধারণত আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হওয়ায় অনেকেই রাজধানী তেহরানে ফিরতে চাইছেন না। মিনা ও তার পরিবারও তেহরান ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। সাধারণত নওরোজের আগে ইরানের বাজার, শপিং মল এবং রাস্তাঘাট ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকে।
তবে এবার সেই উৎসবের আমেজ ও কোলাহল অনেকটাই ম্লান। তেহরানের বাসিন্দা ২০ বছর বয়সী তরুণী পারমিস জানান, আগে নওরোজের কেনাকাটা অনেক সহজ ছিল, কিন্তু এখন সর্বত্রই হঠাৎ বিমান হামলার আতঙ্ক কাজ করে। তা সত্ত্বেও অনেকেই ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মাঝেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন। পারমিস উল্লেখ করেন, তিনি একটি সেলুনে থাকাকালীন হঠাৎ বড় ধরনের বিস্ফোরণ হলেও উপস্থিত মানুষজন খুব একটা আতঙ্কিত হয়নি। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আসন্ন নওরোজ ঘিরে ইরানিদের মাঝে মিশ্র অনুভূতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মরিয়ম নামের এক নারী জানান, এখনও কিছু মানুষ উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী হাফ্ত সিন টেবিল সাজানোর জন্য তারা বাজারে যাচ্ছেন। রাস্তায় ফুল ও অন্যান্য সামগ্রীর বিক্রেতাদের দেখা গেলেও আগের বছরগুলোর মতো উৎসবমুখর পরিবেশ আর নেই।
মরিয়মের মতে, নওরোজ বছরে মাত্র একবারই আসে, তাই এটি উদযাপন করা উচিত। তিনি নিজেও হাফ্ত সিন সাজানোর জন্য কেনাকাটা করেছেন এবং উৎসব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ এম/ ২০ মার্চ ২০২৬









