বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া

নয়াদিল্লি, ১৪ ফেব্রুয়ারি – জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ বিদায় নেওয়ার পর প্রায় দেড় বছর নির্বাচিত সরকার ছাড়াই দেশ চলার পর শেষ পর্যন্ত বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই নির্বাচনে বড় ব্যবধানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এর মাধ্যমে প্রায় ২০ বছর পর দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি প্রধান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, এই ফলাফল তার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
দিল্লির এই শুভেচ্ছাবার্তা ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যও তারা প্রচার করে।
নির্বাচনের পরদিন বিকেলে আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— ‘নৌকাবিহীন ভোটে বাংলাদেশের আস্থা চেনা ধানের শিষের উপর, ক্রমশ পিছোতে পিছোতে কুড়ি বছর পর “সবার আগে” বিএনপি।’ সেখানে বলা হয়, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি খালেদা ও হাসিনাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। এই অক্ষ থেকে রাজনীতিকে বের করে আনার কথা জামায়াত ও এনসিপি নেতারা বললেও জনগণ অচেনা বা কম চেনা নেতৃত্বের হাতে শাসনভার দিতে এখনো স্বচ্ছন্দ নয়।
আরও বলা হয়, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে নির্বাচনে নামা বিএনপিকেই জনগণ সামনে রেখেছে। আনুষ্ঠানিক ফল না এলেও গণনায় স্পষ্ট, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০ বছর পর ঢাকার ক্ষমতায় ফিরছে প্রয়াত খালেদা জিয়ার দল।
অন্য এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— ‘ভোটে হারলেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সেরা ফল জামায়েতের, শফিকুরদের উত্থান কি চাপে ফেলবে ভারতকে?’
শুক্রবার সকালে আরেক শিরোনাম ছিল— ‘তারেককে অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যমে বাংলায় পোস্ট মোদির, একসঙ্গে কাজের বার্তা, শুভেচ্ছা জানালো আমেরিকাও’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রথমে ইংরেজি পরে বাংলায় পোস্ট করে তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন, সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নির্ণায়ক বিজয়ের দিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাকে অভিনন্দন। একই সঙ্গে তিনি আবারও লেখেন, এই ফলাফল তার নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা এবং ভারত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
মোদি আরও আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার এবং অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করা হবে।
একই দিনে আরেক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— ‘ঘনিষ্ঠতা চায় পাকিস্তান, বাংলাদেশে তারেক রহমানের জয় নিশ্চিত হতেই পোস্ট পাক প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের! কী বার্তা।’ এতে বলা হয়, সব ঠিক থাকলে তারেক রহমানই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। জয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অভিনন্দন জানান এবং সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বার্তা দেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির কাছ থেকেও বার্তা আসে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বেড়েছে। ঢাকা-করাচি রুটে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে এবং বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে পাকিস্তান।
ভোটের দিন বিকেলে নির্বাচনের খবরের পাশাপাশি শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়েও আলাদা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যা পরদিন দুপুরেও ওয়েবসাইটে ছিল। সেখানে বলা হয়, হাসিনা দাবি করেছেন জনগণ এই ‘প্রহসনের ভোট প্রত্যাখ্যান’ করেছে এবং কম অংশগ্রহণ সেটির প্রমাণ।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র শুভেচ্ছাবার্তাও প্রচার করে এই সময়। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান, তার দল ও অন্যান্য দলকে অভিনন্দন জানান এবং দুই বাংলার সুসম্পর্ক কামনা করেন।
আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়— ‘বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত’, খালেদাপুত্র তারেককে বার্তা নরেন্দ্র মোদির। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে, এখন নজর সেই দিকে।
আজকালর প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও মোদি থেকে মমতা— সবাই তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় বলা হয়, দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা ভোট প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছেন এবং মোদি তারেক রহমানকে বার্তা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে শোকবার্তা লিখেছিলেন। ভারতের সংসদেও শোক জানানো হয়েছিল।
দ্য স্টেটসম্যান বাংলা সংস্করণে দুটি প্রধান প্রতিবেদন ছিল— একটিতে বলা হয় বিএনপি ২১২ আসনে এগিয়ে সরকার গঠনের পথে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। অন্যটিতে বলা হয়, ভোটের হার ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কে রাজনীতি উত্তপ্ত থাকতে পারে।
সংবাদ প্রতিদিন বেসরকারি ফল প্রকাশের পর ব্যানার শিরোনাম দেয় ‘প্রত্যাবর্তনেই পরিবর্তন’। আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দিয়েছে এবং পাকিস্তান-চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করা হয়, বিশেষ করে ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চল ও শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে।
সেদিন বিকেলে টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনে মোদি-তারেক ফোনালাপের খবর প্রকাশ করে এবং শান্তি ও অগ্রগতির আশ্বাস পুনর্ব্যক্তের কথা জানায়।
হিন্দুস্তান টাইমস অনলাইন সংস্করণে পরদিনও লাইভ কভারেজে বিএনপির ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসার খবর ও মোদির বার্তা প্রচার করা হয়, যেখানে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাসের কথা বলা হয়।
দ্য হিন্দু লাইভ আপডেটে নির্বাচনের ফল নিয়ে জামায়াতের অসন্তোষ তুলে ধরে এবং তারেক রহমানের উত্থান নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করে।
ইন্ডিয়া টুডেও নির্বাচন, বিএনপির জয় ও মোদির অভিনন্দন নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সেখানে বলা হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
এনএন/ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









