জাতীয়

বিএনপির আপত্তির মধ্যেই প্রায় ৭ লাখ ভোটার স্থানান্তরের অনুমোদন দিল নির্বাচন কমিশন

ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি – আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশে প্রায় ৬ দশমিক ৭ লাখ ভোটার স্থানান্তরের আবেদন অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে ৭ লাখের বেশি আবেদন জমা পড়ে। এই সময়ের মধ্যে ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনে স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার।

এ বিষয়টি ঘিরে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে এবং নির্বাচনি এলাকা পর্যায়ে কারসাজি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন। এরপর ঢাকায় ৮৬ হাজার ৮২৫ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে। বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে যথাক্রমে ৮৫ হাজার ৭২০ জন এবং ৮১ হাজার ৭২৫ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৭৮ হাজার ৮০৫ জন, রাজশাহীতে ৭২ হাজার ৮১৫ জন এবং রংপুরে ৬৩ হাজার ৮৯৭ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে।

ফরিদপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে যথাক্রমে ৩৯ হাজার ৯৫ জন এবং ৩০ হাজার ৮৫ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেটে সবচেয়ে কম, ২৭ হাজার ৫৭৬ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন।

এদিকে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভোটার স্থানান্তর করছে, যাতে কিছু নির্বাচনি এলাকায় জয় নিশ্চিত করা যায়।

গত রোববার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সেখানে তারা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ভোটার স্থানান্তর নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।

নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক নয়।

এর জবাবে নির্বাচন কমিশন জানায়, তাদের তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা ২ হাজার থেকে ৩ হাজারের মধ্যে রয়েছে।

তবে বিএনপি এই ব্যাখ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, এই পরিসংখ্যান সঠিক নয় এবং কমিশন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে নির্ভুল তথ্য পায়নি।

নজরুল ইসলাম বলেন, কমিশনের উত্তরে তারা সন্তুষ্ট নন, কারণ সংখ্যাগুলো বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা আরও বেশি। সে কারণেই তারা নির্বাচনি এলাকা অনুযায়ী বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন।

এর আগেও, গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা অঞ্চলের ৫৩টি থানায় ভোটার স্থানান্তরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এতে দেখা গেছে, মিরপুরে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬২৭ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন। এরপর ডেমরায় ১ হাজার ৪৪৪ জন এবং পল্লবীতে ১ হাজার ২৩৫ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে।

কেরানীগঞ্জে ১ হাজার ২০৭ জন, বাড্ডায় ৮৫১ জন, কাফরুলে ৮১১ জন, সাভারে ৭৭১ জন, খিলগাঁওয়ে ৭৪২ জন এবং যাত্রাবাড়ীতে ৭১৭ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকার ২০টি আসনে মোট ভোটার ছিল ৮১ লাখ ৭০ হাজার ৫১৯ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৫ জনে। এতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৬৬ জন বেড়েছে।

ঢাকা-১ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩১ হাজার ৫৩১ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৪০ জনে। অন্যদিকে ঢাকা-২ আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৮ জন থেকে কমে ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৫ জনে নেমেছে, অর্থাৎ এখানে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন ভোটার কমেছে।

অন্যান্য কয়েকটি আসনেও ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৪ আসনে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৯ জন, ঢাকা-৭ আসনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৭ জন, ঢাকা-১০ আসনে ৬৩ হাজার ৭২৭ জন এবং ঢাকা-১৪ আসনে ৩৭ হাজার ৮৩২ জন ভোটার বেড়েছে।

ঢাকা-৩ আসনে ১৯ হাজার ৬১৭ জন, ঢাকা-৬ আসনে ১০ হাজার ৮৫১ জন, ঢাকা-৮ আসনে ৪ হাজার ৮২১ জন, ঢাকা-৯ আসনে ১৯ হাজার ৪০৮ জন, ঢাকা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৪১ জন, ঢাকা-১২ আসনে ২০৯ জন, ঢাকা-১৩ আসনে ১৩ হাজার ৩৫৫ জন, ঢাকা-১৫ আসনে ৭ হাজার ১২১ জন, ঢাকা-১৬ আসনে ১২ হাজার ২৫৮ জন, ঢাকা-১৭ আসনে ৯ হাজার ৮৪৫ জন, ঢাকা-১৮ আসনে ২৫ হাজার ৩৩৪ জন এবং ঢাকা-২০ আসনে ২০ হাজার ৬৫৭ জন ভোটার বেড়েছে।

দুটি আসনে ভোটার কমেছে। ঢাকা-৫ আসনে ৭০ হাজার ৭৬৮ জন এবং ঢাকা-১৯ আসনে ১৮ হাজার ৩৪৬ জন ভোটার কমেছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি ও হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে নির্বাচনের আগে নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণকে দায়ী করা যায়।

ঢাকা-২, ঢাকা-৪, ঢাকা-৫, ঢাকা-৭, ঢাকা-১০ এবং ঢাকা-১৪—এই ছয়টি আসনে বড় ধরনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছিল, যার ফলে ভোটার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

এ ছাড়া নতুন ভোটার যুক্ত হওয়া এবং সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধিও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভোটার সংখ্যার তারতম্যের অন্যতম কারণ বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এনএন/ ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language