জাতীয়

গুমের ঘটনায় কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট: রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট

ঢাকা, ০৪ জানুয়ারি – গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় কমিশনের সদস্যরা প্রতিবেদন জমা দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।

কমিশন জানিয়েছে, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্তে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়ে।

এখনো অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন জানিয়ে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আরও ভিক্টিমের খবর পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমাদের বিষয়ে জানেন না বা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছেন যাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করলেও অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’

কমিশন সদস্যরা জানিয়েছেন, বলপূর্বক গুমের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। তারা বলেন, আমাদের কাছে যে ডেটা এসেছে তা দেখাচ্ছে যে এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ।

প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গুমের শিকারদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনও নিখোঁজ তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

কমিশন সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেক গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকারদের ভারতে রেন্ডিশন (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া গোপনে হস্তান্তর) সংক্রান্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে এটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ঘটেছে।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস গুম তদন্ত কমিশনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যারা গিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা নৃশংস ঘটনাগুলো দেখেছি। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এই কাজ সম্ভব হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে গণতন্ত্রের আড়ালে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে তার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট। যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের মতোই মানুষ, কিন্তু নৃশংসতা ঘটিয়ে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে আমাদের এমন নৃশংসতা থেকে চিরতরে বের হতে হবে এবং প্রতিকার খুঁজে বের করতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। পাশাপাশি কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার নির্দেশ দেন।

এছাড়া, যেসব জায়গায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে তা ম্যাপিং করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

কমিশন জানিয়েছে, তদন্তে বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকারকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলা হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, ‘আপনি দৃঢ় ছিলেন বলেই আমরা পেরেছি। সবসময় আমাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন এবং মনোবল দিয়েছেন।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে আহ্বান জানান এবং ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।

এনএন/ ০৪ জানুয়ারি ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language