
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৭ ডিসেম্বর- পরিবেশ আইন অমান্য করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আখাউড়ায় পাহাড়ি উঁচু টিলাভূমি ধ্বংস করে নির্মাণাধীন আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্পের মাটির জোগান দিচ্ছেন স্থানীয় একশ্রেণির অসাধু ঠিকাদার। দিনদুপুরে ভেকু দিয়ে ভারি ট্রাকে করে এসব পাহাড়ের মাটি কেটে নিলেও পরিবেশ অধিদফতর এবং স্থানীয় প্রশাসন রহস্যজনক কারণে অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে। তবে সময় সংবাদের এ প্রতিবেদকের মাধ্যমে খবর পেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন স্থানীয় প্রশাসনসহ পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ কাজের জন্যে মাটির জোগান হিসেবে আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মিনারকুট গ্রামের উঁচু পাহাড়ি ভূমি কেটে পুকুরে পরিণত করা হচ্ছে। আর এসবের পেছনে কাজ করছে এক শ্রেণির ভূমি খেকো ঠিকাদার। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবান্ধব পাহাড়ের এমন করুন ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলেও রহস্যজনক কারণে অনেকটাই নীরব পরিবেশ অধিদফতরসহ স্থানীয় প্রশাসন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আখাউড়া এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকার সচেতন সাধারণ মানুষ।
নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন সিকিউরিটি গার্ড জানান, দক্ষিণ মিনারকুট গ্রামের যে জায়গার মাটি কাটা হচ্ছে সে জায়গা আখাউড়া উপজেলার রাজিব ভূইয়া নামে এক ব্যক্তি সেটি কিনে নিয়েছেন। এখন আখাউড়া-আগরতলা রেললাইন নির্মাণকাজে পাহাড়ের মাটি কেটে কাজে লাগাচ্ছেন।
পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে স্থানীয় ঠিকাদার মো. রাজিব ভুইয়া বলেন, ‘এই জায়গা আমার নিজের ক্রয় করা। নিজের জায়গায় আমি মাটি কেটে পুকুর তৈরি করেছি। এখানে আমার মতো আরো অন্তত ৫০ জন আছে যারা নিজের জায়গায় পুকুর তৈরি করেছে। মাটিগুলো ইন্ডিয়ার রেলওয়ে কোম্পানি নিয়ে যাচ্ছে আর আমরা পুকুর তৈরি করছি। এখানে কোনো পাহাড় কাটা হয়নি। ইন্ডিয়ার রেললাইন তৈরিতে মাটি প্রয়োজন সে জন্য যে জায়গায় কোনো ফসল হয় না সেখানে মাটি কেটে জলাশয় তৈরি করা হচ্ছে।’
ঠিকাদার রাজীব আরো জানান, আমি আমেরিকা প্রবাসী ১৫-২০ দিন পর সেখানে চলে যাব। আমার বাড়িতে রেলওয়ে ঠিকাদারি কোম্পানির কর্মকর্তারা ভাড়া থাকেন। আমি পাহাড় যে কাটছি না তারা আরও ভালো বলতে পারবেন।
আখাউড়ার বাসিন্দা ও উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মোমিন বাবুল বলেন, যারা পাহাড় কাটছে তারা আমাদের শত্রু। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আছে কোনোভাবেই পাহাড় কাটা যাবে না। কোনো পুকুর ভরাট করা যাবে না। এ ব্যাপারে সরকার শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক নীহার রঞ্জন সরকার বলেন, বাংলাদেশে সরকারিভাবে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করা আছে। কারণ এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ কাজের নামে ভূমি খেকোরা পাহাড় কেটে নিচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে দাবি জানাচ্ছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক দীপক চৌধুরী বাপ্পী বলেন, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পাহাড় অনেক বড় ভূমিকা রাখে। উন্নয়নের নামে পাহাড় কেটে পাহাড় ধ্বংস করা অব্যশই আইনবিরোধী কাজ। রাষ্ট্রীয় আইনেও রয়েছে পাহাড়-নদী এগুলো নষ্ট করা যাবে না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাব, যেন উন্নয়নের নামে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করা না হয়।
এদিকে দিনদুপুরে পাহাড় কেটে সাবাড় করা হলেও অনেকটাই নীরব আখাউড়া মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল ভূইয়া।
তিনি জানান, তার ইউনিয়নে পাহাড় কাটা হচ্ছে সেটি অবগত নন। তবে তিনি শুনেছেন কেউ কেউ টিলামাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তবে পাহাড়কাটা খারাপ উল্লেখ করে চেয়ারম্যান কামাল ভূঁইয়া বলেন, পাহাড় কাটলে বাংলাদেশের পরিবেশ ভারস্যাম নষ্ট হয়ে যাবে। তবে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণকাজে পাহাড়া কাটার কথা তিনি জানেন না। তিনি বিষয়টি সরজমিনে দেখবেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিজ এলাকার সংসদ সদস্য আইনমন্ত্রীকে জানাবেন বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন- ২০৩০ সালে রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাবো: অর্থমন্ত্রী
এ ব্যাপারে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূরে আলম জানান, পাহাড় কাটা বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। আপনার (সময় টিভির সাংবাদিক) মাধ্যমে জানতে পারলাম। সরকারিভাবে নিষিদ্ধ পাহাড় কাটা, সেটি যদি কেউ করে থাকে তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সহকারী কমিশনার ভূমিকে নির্দেশ দেন।
পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. নূরুল আমীন জানান, সরকার যখন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তখন আমাদের পরামর্শ নিয়েই কাজ করে। সেখানে ঠিকাদারকে আমাদের কিছু নির্দেশনা দেওয়া থাকে। যেমন পাহাড়, জলাশয় যেগুলো পরিবেশ সুন্দর রাখেন। এসব প্রাকৃতিক সম্পদে হাত দেওয়া যাবে না। কিন্তু কিছু সময় ঠিকাদাররা সে নিদের্শনা মানতে চায় না। তারা তাদের আর্থিক লাভের জন্য ভূমি দস্যু,পাহাড় দস্যুদের কাছ থেকে মাটি কিনে নিয়ে যায়। ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ কাজে পাহাড় কাটার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করব।
সূত্রঃ সময় নিউজ
আডি/ ১৭ ডিসেম্বর









