ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: ক্ষমতার সমীকরণে নেতানিয়াহুর ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রস্তাব ও আরব দল নিয়ে হুশিয়ারি

তেল আবিব, ০৮ নভেম্বর – ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভূতপূর্ব অচলাবস্থা ও চরম উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক দিকে তাঁর হাত থেকে ক্ষমতা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার (Yashar) পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে সরকার গঠনের প্রথম আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
সংবিধান অনুযায়ী আইজেনকোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। গাদি আইজেনকোট এই দৌড়ে এগিয়ে যেতেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন নেতানিয়াহু। শনিবার রাতে এক জরুরি ভিডিওবার্তায় তিনি সব ইহুদিবাদী দলকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী শিবিরকে কড়া হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।
নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা ও আরব দল ‘জুজু’
ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু দাবি করেন, গাদি আইজেনকোট ও বিরোধী দলগুলো নেসেটের আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের সমর্থক বা ইসলামপন্থি ও ইহুদিবিরোধী মানসিকতার সমর্থক এসব আরব দলগুলোর ওপর ভিত্তি করে গঠিত কোনো সরকার ভেতর থেকেই দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।
নেতানিয়াহু বলেন, আরব দলগুলোর ওপর সরকার নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তারা কখনোই গাজা কিংবা লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বা জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। এই সম্ভাব্য বিপর্যয় রুখতে তিনি নিজের পুরোনো জোটের চরমপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোসহ (যেমন—’রিলিজিয়াস জায়নজম’ ও ‘ওতজমা ইহুদিত’) সকল ইহুদিবাদী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিয়ে একজোট হয়ে ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ গড়ার জোর তাগিদ দিয়েছেন।
আইজেনকোটের পাল্টা আঘাত ও ৪ নীতি
তবে নেতানিয়াহুর এই প্রস্তাবকে চরম ভণ্ডামি ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছে গাদি আইজেনকোটের দল ‘ইয়াশার’। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর উগ্র ডানপন্থী সঙ্গীদের সঙ্গে হাত মেলানোর প্রশ্নই ওঠে না। যদি লিকুদ পার্টি সত্যিই ঐক্য চায়, তবে আগে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে নিজেদের পুরোনো জোট ভাঙতে হবে এবং আইজেনকোটের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে।
সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে আইজেনকোট নির্দিষ্ট ৪টি নীতি ঘোষণা করেছেন:
১. হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা।
২. ইসরায়েলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সমুন্নত রাখা।
৩. স্বাধীনতার ঘোষণার মূল চেতনাকে গ্রহণ করা।
৪. কট্টর অর্থোডক্স গোষ্ঠীসহ দেশের সকল নাগরিকের জন্য সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা (Military Service) চালু করা।
আইজেনকোট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, নেসেটের যেসব সদস্য এই চার নীতি মানবেন, তাঁদের নিয়েই তিনি পরবর্তী সরকার গঠনে প্রস্তুত।
কোন পথে ইসরায়েলের ভাগ্য?
বর্তমানে সরকার গঠনের মূল চাবি সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের হাতে। তিনি যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নেসেটের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট হারজগ হয়তো পুনরায় নেতানিয়াহুকে সুযোগ দেবেন কিংবা দেশকে গড়ায় যেতে হবে আরও একটি নতুন নির্বাচনের দিকে।
আরব দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে নেতানিয়াহুর চরম উদ্বেগের কথা প্রকাশ এবং বিপরীতে আইজেনকোটের নীতিগত শক্ত অবস্থান—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন অত্যন্ত নাটকীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এনএন/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬







