ফুটবল

বিশ্বকাপে স্পেনকে রুখে রাতারাতি তারকা, খ্যাতির চাপে কঠিন সময় পার করছেন ভোজিনহা

ভোজিনহা

প্রায়া,০৮ নভেম্বর-বিশ্বকাপে স্পেনকে রুখে দিয়ে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। তবে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর হঠাৎ পাওয়া এই খ্যাতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখনো চেষ্টা করছেন অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। ৪০ বছর বয়সী এই খেলোয়াড়ের পুরো নাম জোসিমার হোসে এভোরা ডিয়াস।

বিশ্বকাপের পর গত জুলাইয়ে তিনি চিলিতে পাড়ি জমান। বর্তমানে নতুন ক্লাব ‘কোলো কোলো’-তে নিজেকে মানিয়ে নিতে বেশ কঠিন সময় পার করছেন তিনি। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের হয়ে নিজের অভিষেক ম্যাচেই স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ভোজিনহা। তার দল শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয়। এরপর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত হেরে যায় তারা। আটলান্টায় স্পেনের বিপক্ষে সেই ম্যাচের আগে ভোজিনহা ছিলেন সাধারণ একজন গোলরক্ষক। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন পর্তুগাল, সাইপ্রাস ও স্লোভাকিয়ার তুলনামূলক কম পরিচিত ক্লাবগুলোতে।

বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দলের বিপক্ষে গোল না খেয়ে ম্যাচ শেষ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে কয়েক লাখে পৌঁছে যায়। বর্তমানে তার অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ৭৫ লাখ। সেই ম্যাচের পর আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেছিলেন ভোজিনহা। একদিকে নিজের ও দলের বড় অর্জনের আনন্দ, অন্যদিকে মায়ের জন্য ভিসা জোগাড় করতে না পারার কষ্ট তাকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল। ছেলের এই সাফল্য দেখতে তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর সবচেয়ে সফল ক্লাব ‘কোলো কোলো’-তে যোগ দেওয়ার পর হাজার হাজার দর্শকের সামনে আতশবাজির ঝলকানিতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। অ্যাডিডাস, পেপসি ও রেড বুলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোও তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারণার মুখ হিসেবে ভোজিনহাকে যুক্ত করেছে। সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। বর্ষসেরা পুরুষ গোলরক্ষক নির্বাচনের ভোটাভুটিতে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন ভোজিনহা।

তবে মাঠের খেলায় বেশ কঠিন সময় পার করছেন গত মৌসুম পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগে কাটানো এই গোলরক্ষক। নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত কোলো কোলোর হয়ে সম্ভাব্য ১৪টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে কোলো কোলো কোপা লিবার্তাদোরেস জিতেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে এই প্রতিযোগিতাকে চ্যাম্পিয়নস লিগের সমতুল্য মনে করা হয়।

চলতি সপ্তাহান্তে তার নতুন দল চিলির লিগ শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী বছরের কোপা লিবার্তাদোরেসে জায়গা নিশ্চিত করার পথেও এগিয়ে আছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ম্যাচেও ভোজিনহাকে সম্ভবত বদলি খেলোয়াড় হিসেবেই দেখা যাবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছিলাম লিবার্তাদোরেসে খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে এখন আমার পুরো মনোযোগ এই সপ্তাহের দিকে। এরপরই ঠিক হবে আমার ভবিষ্যৎ কী হবে। আপাতত এসব নিয়ে ভাবছি না।’

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ভোজিনহার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। নতুন একটি দেশে পাড়ি জমানোর পাশাপাশি অচেনা একজন মানুষ থেকে রাতারাতি এমন এক তারকায় পরিণত হয়েছেন, যার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে তিনি আবর্জনা সংগ্রহের কাজ করতেন।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য অবজারভার’-কে ভোজিনহা বলেন, ‘আমি আমার শান্তি ও প্রশান্তি হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে আর কিছুই নেই। আগে যতটা ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক কমে গেছে। বাইরে বের হলে বা কোনো রেস্তোরাঁয় গেলে কেউ না কেউ আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চায় কিংবা অটোগ্রাফ চায়। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, কেউ কেউ আমাকে ভিডিও করতে শুরু করে।’

কোলো কোলোতে যোগ দেওয়ার প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভোজিনহা নিয়মিত সান্তিয়াগোর অভিজাত এলাকা ভিটাকুরায় অবস্থিত একটি বেকারি বা ক্যাফেতে যেতেন। ‘মেতিসাজ’ নামের ওই ক্যাফের ব্যবস্থাপক গুস্তাভো কাসিন এএফপিকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, সেখানে যাওয়া তার জন্য ভালো ছিল। কারণ, সেখানে তিনি সবার কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেতেন এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেতেন।’

কাসিনের সঙ্গে ভোজিনহার কখনোই ফুটবল নিয়ে কথা হতো না। সকালের নাশতার জন্য ‘ক্রোয়াসাঁ’ (এক ধরনের পেস্ট্রি) আসার অপেক্ষায় থাকাকালে এই ফুটবলার নিজের দেশের কথা খুব আবেগ নিয়ে বলতেন। অতীতে ফুটবল খেলার পাশাপাশি বিচ ভলিবল শেখানোর কাজও করতেন তিনি। সেই সময় এখন তার কাছে কেবলই সুদূর অতীতের স্মৃতি। ‘দ্য অবজারভার’-কে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আজকের জীবন আর আগের জীবনের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলা হলে আমি আগের জীবনটিই বেছে নিতাম।’

২০২৭ সাল পর্যন্ত ভোজিনহা সেখানে থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কোলো কোলোর সঙ্গে তার ছয় মাসের চুক্তি হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সময় মাঠে খেলার সুযোগ পেলেই কেবল চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো যাবে। এরই মধ্যে চিলির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ক্লাউদিও ব্রাভো তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

চিলির সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘এমন কিছু পরিস্থিতিতে তিনি বেশ কয়েকটি ভুল করেছেন, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া বা সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। আর আপনার মধ্যে যদি সেই সমন্বয় না থাকে, তাহলে কখনোই ভালো কিছু করতে পারবেন না।’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভোজিনহার হাতে এখন আর মাত্র কয়েকটি ম্যাচ বাকি রয়েছে। সম্ভবত এই ম্যাচগুলোর মধ্য দিয়েই চিলিতে তার এই নতুন যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে।

এস এম/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language