বাংলাদেশে আগামী ৫–৭ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে বিশ্বব্যাংক

ঢাকা,০৮ নভেম্বর-বাংলাদেশে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য কাজের সুযোগ বাড়ানো, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং নতুন বিনিয়োগের পথ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগের ওপর জোর দেবে সংস্থাটি।
২০২৭ থেকে ২০৩৩ অর্থবছর পর্যন্ত সম্ভাব্য মেয়াদ ধরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরির কাজ চলছে। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের তিনটি প্রতিষ্ঠান—ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং মাল্টিল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সির (এমআইজিএ) কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ কোন কোন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে এবং কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে, তা এই কৌশলগত কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশে এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সবচেয়ে জরুরি উন্নয়ন অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে সবার মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ বাংলাদেশি শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু একই সময়ে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ২০২২ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জানান, এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই নতুন অংশীদারত্ব কাঠামোর প্রধান লক্ষ্য হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বিশেষ করে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর ভিত্তিতেই এই পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
নতুন কাঠামো তৈরির জন্য দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করা হচ্ছে।
জ্যঁ পেসমে বলেন, বেসরকারি খাতে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরির পথে যেসব মৌলিক বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করার বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহায়তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে, সেসব খাতেই অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, একদিকে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা হবে।
জ্যঁ পেসমে বলেন, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য আরও বেশি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ কীভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে, সে বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের পরামর্শ ও মতামত জানতে চায় সংস্থাটি।
নতুন সিপিএফ তৈরির অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ইতোমধ্যে পরামর্শ কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রধান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ এবং অগ্রাধিকার সম্পর্কে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী অংশ নিতে পারবেন।
এ ছাড়া ইংরেজি ও বাংলা—দুই ভাষায় অনলাইন জরিপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
জরিপে মূলত তিনটি বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অগ্রাধিকার কোনগুলো হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, অর্থায়ন, জ্ঞান ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের কোন কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, আরও বেশি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কী ধরনের সংস্কার দরকার।
কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক হলো কোনো দেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কয়েক বছর মেয়াদি সহযোগিতার একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা, গবেষণা এবং অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে নতুন সিপিএফ তৈরির প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, আসন্ন সিপিএফে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিফলন দেখতে চাইবে বাংলাদেশ সরকার।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক নতুন সিপিএফের চূড়ান্ত খসড়া জমা দেওয়ার পর ইআরডি সেটি পর্যালোচনা করবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও মতামত তুলে ধরবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ৩৭টি প্রকল্পে মোট ১ হাজার ১২০ কোটি ডলারের সহায়তা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২০২২ সালে ছিল ২২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৩ সালে তা ছিল ২৩০ কোটি ডলার, ২০২৪ সালে ৩৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ২০২৫ সালে ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ২০২৬ সালে ১৬২ কোটি ডলার।
এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মৌলিক নীতিগত বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই। যৌথ কর্মপরিকল্পনার আওতায় আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত বিষয়গুলো ঠিক করা হবে।
গত মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ কথা জানান।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। সংস্থাটির অর্থায়ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি খাতের অগ্রগতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এস এম/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬







