তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যু: বন্ধু দ্বীপের বয়ান ও পরিবারের চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঢাকা, ২৯ অক্টোবর – দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’—মায়ের কাছে এই কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরিকে। চাঞ্চল্যকর এই মৃত্যুর ঘটনায় বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের সাক্ষাৎকার ও পরিবারের বক্তব্যে নতুন করে রহস্যের জাল তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। এর পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরখানের তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনায় জনমনে তীব্র শোক ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শেষ রাতের সেই মুহূর্ত: যা বলছেন বন্ধু দ্বীপ
ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তার দীর্ঘদিনের বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ সাক্ষাৎকারে পুরো রাতের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, তাহসিফের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় ৬ বছরের।
দেখা হওয়ার কারণ: সম্প্রতি তাহসিফের মোটরসাইকেলটি নষ্ট থাকায় দ্বীপের সাহায্য চান তিনি। প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টা করে গাড়িটি চালু করার পর ওয়ার্কশপে নিয়ে মেরামত করা হয়।
কুক কুক রেস্টুরেন্টে ডিনার: গাড়ি ঠিক করার পর ধন্যবাদ জানাতে দ্বীপকে ডিনারের প্রস্তাব দেন তাহসিফ। উত্তরা আশকোনা এলাকার একটি শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুক কুক’ রেস্টুরেন্টে তারা রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত একসঙ্গে সময় কাটান।
স্বাভাবিক আচরণ: দ্বীপের দাবি, ডিনারের সময় তাহসিফ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও হাসিখুশি ছিলেন। তাঁর আচরণে কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা টেনশন লক্ষ্য করা যায়নি। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের হাসাহাসি করতে দেখা গেছে।
ফোনকল ও আলাদা হওয়া: খাওয়ার সময় তাহসিফের একটি ফোন এসেছিল এবং তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। ডিনার শেষে হাউজ বিল্ডিং এলাকায় এসে তারা দুজন আলাদা হয়ে যান। দ্বীপ তার মোহাম্মদপুরের বাসায় ফেরেন এবং তাহসিফকে ফোন দিলে তা বন্ধ পান (কারণ রেস্টুরেন্টে তাহসিফের ফোন পাওয়ার ব্যাংকে চার্জ দেওয়া হয়েছিল)।
অচেনা এলাকা: তুরাগ নদ বা উত্তরখান এলাকায় নিজের জীবনে কখনো যাননি বলে দাবি করেছেন দ্বীপ। তাহসিফের কোনো শত্রু বা বিরোধের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।
যা বলছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল
ছেলের এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তাহসিফ অত্যন্ত ভদ্র ও সামাজিক প্রকৃতির ছিল। বিমানবাহিনী থেকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে বরখাস্ত হওয়ার পর সে বিসিবি, নেত্র নিউজ এবং সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কাজ করেছে।
ছেলের নিখোঁজ হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বাবা বলেন, “২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার আগে সারাদিন তাহসিফ তার মায়ের সঙ্গে ছিল এবং কেনাকাটা করে। সন্ধ্যার পর জুনিয়র বন্ধু দ্বীপ এসে তাকে ডাকলে সে মাকে বলে—‘দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’। এরপর নিচে নেমে আর ফেরেনি।”
বাবা আরও জানান, ঘটনার রাতে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মেসেজ পাঠিয়েছিল—‘মামি আসছি’। কিন্তু এরপর আর তার কোনো খোঁজ মেলেনি। পরদিন পুলিশ বা হাসপাতাল থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সহযোগিতা না পেয়ে বিকেলে উত্তরখান থানার ওসির মাধ্যমে তুরাগ নদ থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা। অথচ যেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই এলাকায় তাহসিফ কখনো যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন তার বাবা।
তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
নৌ-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, ছেলে মাঝেমধ্যে কিছুটা আশঙ্কার কথা বললেও সুনির্দিষ্ট করে কোনো হুমকির কথা জানায়নি। একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যু কীভাবে ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার।
এনএন/ ২৯ অক্টোবর ২০২৬







