আইন-আদালত

সাগর-রুনি হত্যা মামলা: উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে আরও ৬ মাসের সময় দিলেন হাই কোর্ট

ঢাকা, ২৭ অক্টোবর – এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে নতুন মোড়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত মূল্যায়নের মাধ্যমে মামলায় দুজনের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এ অবস্থায় মামলার তদন্ত পুরোপুরি শেষ করতে পিবিআই ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাসের সময় দিয়েছেন হাই কোর্ট। আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্তের সার্বিক অগ্রগতি আদালতকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং বাদীপক্ষে আইনজীবী শিশির মনি উপস্থিত ছিলেন।

৩০০ সিডি ও নতুন তথ্য:

আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সাথে পর্যালোচনায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে দুজনের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই তথ্যের স্বাধীন যাচাই-বাছাই এবং অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা বের করার কাজ এখনো বাকি।

তাছাড়া, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে জব্দ করা প্রায় ৩০০টি সিডির (যার মধ্যে বিভিন্ন তথ্য, ভিডিও, অডিও ও অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত রয়েছে) মধ্যে ইতোমধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন শেষ করেছে তদন্ত দল। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।

আদালতের বক্তব্য ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি:

আদালতের আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, ফৌজদারি আইনের নিয়ম অনুযায়ী শুধু প্রাথমিক তথ্য পেলেই চলে না, তদন্তকারী কর্মকর্তাকে স্বাধীনভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে সন্তুষ্ট হতে হয়। আইসিটির কাছে থাকা সব নথিপত্র লিখিতভাবে চাওয়া হয়েছে এবং সেগুলো হস্তান্তরিত হলে চূড়ান্ত রূপরেখা পাওয়া যাবে। এ কারণেই তদন্তের জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ এক বছরের সময় আবেদন করলেও বাদীপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির আদালতে যুক্তি দেন যে, জাতীয়ভাবে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত এত দীর্ঘায়িত হওয়া অনুচিত। সিডি মূল্যায়নে অতিরিক্ত সময় না নিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দেন তিনি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত (৬ মাস) সময় মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষ আশা প্রকাশ করছে, নির্ধারিত তারিখে টাস্কফোর্সের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে চূড়ান্ত অগ্রগতি উপস্থাপন করবেন।

এক যুগের বিচারহীনতার ইতিহাস:

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের একমাত্র শিশুপুত্র মাহির সরওয়ার মেঘ বাসতেই উপস্থিত ছিল।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতকদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ ১২ বছর পার হলেও মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়নি। শেরেবাংলা নগর থানা, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় র‌্যাবের হাতে তদন্তভার থাকলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অবশেষে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র‌্যাবকে মামলার তদন্ত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং হাই কোর্টের নির্দেশে গঠিত হয় নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স।

এনএন/ ২৭ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language