বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের ইউক্রেন যুদ্ধে নামাল রাশিয়া: জাতিসংঘের বিস্ফোরক রিপোর্ট

মস্কো, ২৭ অক্টোবর – উন্নত জীবন এবং ভালো উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক পাচার চক্র ও স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সুকৌশলে ফাঁদ পাতা হয়েছিল। আর সেই ফাঁদে পা দিয়েই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৯টি দেশের শত শত নাগরিক। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে প্রতারণা, প্রলোভন এবং চরম চাপের মুখে ফেলে বিদেশি নাগরিকদের ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে রুশ সামরিক বাহিনী। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বরাতে জাতিসংঘের এ তথ্য সামনে আসতেই বৈশ্বিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা ওই প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, প্রধানত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে এই চক্রটি পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, সমাজ ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রান্তিক এবং কম শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষদের বেশি নিশানা বানিয়েছে মস্কো।
যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ:
তদন্তে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ট্রাভেল এজেন্সি ও স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রথমে এদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের সামনে তুলে ধরা হয় রুশ ভাষায় লেখা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চুক্তিপত্র। ভাষা না বোঝার কারণে ভুক্তভোগীরা অজান্তেই সামরিক চুক্তিতে সই করে বসেন। অনেকে চুক্তি সই করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপর নেমে আসে নানা নির্যাতন ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। পুরো বিষয়টি বুঝতে পেরে যখন তারা জানতে পারেন যে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সরাসরি রক্তাক্ত যুদ্ধে নামতে হবে, ততক্ষণে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
২৯টি দেশের তালিকায় যারা রয়েছে:
জাতিসংঘ কমিশন মোট ৪৮টি দেশের ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে এই বাধ্যতামূলক ও প্রতারণামূলক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, বেলারুশ, আজারবাইজান, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলোম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন এবং জিম্বাবুয়ে।
জ্বালানি খাতে হামলা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ:
বিদেশি নাগরিকদের বলির পাঁঠা বানানোর পাশাপাশি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। কনকনে শীতের মধ্যে বরফশীতল তাপমাত্রায় বিদ্যুৎ সেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষকে অমানবিক কষ্টের মধ্যে ফেলার এই নীতিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান এরিক মোসে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় জানান, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে এই আক্রমণগুলো কোনো ভুল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বহুতল ভবনে লিফট বন্ধ হয়ে যায়; ফলে বহু বয়োবৃদ্ধ মানুষ অন্ধকার সাইরেনের শব্দেও নিচে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি। অন্যদিকে, হাসপাতালগুলোতে লাইফ-সাপোর্টে থাকা মুমূর্ষু রোগীরা পড়েন চরম জীবনঝুঁকিতে। কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আড়াই শতাধিক ভুক্তভোগী, চিকিৎসক ও নাগরিক সংস্থার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে এই মানবিক বিপর্যয়ের রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের এই বিস্ফোরক রিপোর্ট ও সমস্ত অভিযোগ এক বাক্যে নাকচ করে দিয়েছে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার মিশন। তারা এই কমিশনকে অগ্রহণযোগ্য দাবি করে আনীত সমস্ত অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘ভুয়া তথ্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এনএন/ ২৭ অক্টোবর ২০২৬







