পশ্চিম তীরে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহতের পর ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভাঙছে ইসরায়েল

তেল আবিব,২৪ অক্টোবর- দখলকৃত পশ্চিম তীরের একটি চেকপয়েন্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ওই এলাকার একটি আবাসিক এলাকার ভবনগুলো ভেঙে ফেলা এবং বাসিন্দাদের জোর করে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে ইসরায়েল। শুক্রবার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই অভিযান শুরু করা হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর এই প্রথম ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। তিনি নিজেকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একজন কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আগামী ২৭ অক্টোবর ভোটগ্রহণের মাত্র চার দিন আগে এই হামলার ঘটনা ঘটল।
হামলার পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তারা হেবরন শহরকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ করছে। নেতানিয়াহুও শুক্রবার থেকে পুরো পশ্চিম তীর বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পর নিজের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা সরে এসে তিনি জানান, হেবরন ও হালহুল শহরের চারপাশে একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করছেন। প্রয়োজনে এই বেষ্টনী অন্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হতে পারে। নেতানিয়াহু আরও বলেন, সামরিক বাহিনী হামলার এলাকা থেকে বাসিন্দাদের জোর করে সরিয়ে দেবে এবং এলাকাটির চেহারা পুরোপুরি বদলে ফেলবে। ২০২৫ সালের শুরুতে জেনিন, তুলকার্ম, নুর শামস ও আল-ফারআ শরণার্থী শিবিরে একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এর ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন এবং পুরো একটি এলাকা খালি হয়ে যায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা (আইএসএ) এক যৌথ ঘোষণায় জানিয়েছে, হেবরন এলাকায় কয়েক দিন ধরে চলার মতো একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী অবকাঠামো ও অস্ত্র খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে বাহিনীগুলো পুরো এলাকায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি শুরু করেছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই অভিযান শুধু সেই এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যেখান থেকে বন্দুকধারীরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল।
আইডিএফ ও আইএসএ জানিয়েছে, ওই এলাকার বাসিন্দারা তিনটি নির্দিষ্ট বের হওয়ার পথ দিয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে পারবেন। তবে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারও আচরণ বা পরিচয় সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সামরিক বাহিনী ও আইএসএ আরও জানিয়েছে, এই অভিযান সকাল থেকে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপগুলোরই ধারাবাহিকতা। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের বাড়ির মানচিত্র তৈরি, হেবরন ও হালহুল এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী আরোপ, সড়কে বাধা স্থাপন এবং পুরো এলাকার বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, এমন স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বি’তসেলেম’ হেবরনের আবাসিক এলাকা থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করার এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, ‘ইসরায়েল তাদের পরবর্তী অপরাধের কথা আগেভাগেই ঘোষণা করছে। নেতানিয়াহু এবং কাটজ হেবরনের একটি ফিলিস্তিনি আবাসিক এলাকা খালি করার এবং পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আগে যে গণহারে বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, এখানেও তার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’
শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। সিএনএনের হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ইসরায়েলি সেনা আবাসন কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের বলছেন, ‘আপনাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট সময় আছে।’
নেতানিয়াহু বলেন, ‘হেবরনের যে পাড়া থেকে সন্ত্রাসীরা এসেছিল, সেখানে আমরা ঠিক এই কাজটিই করব। আমরা বাসিন্দাদের সরিয়ে দেব, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাব, সেখানে পাওয়া সব অস্ত্র সরিয়ে নেব এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামোর সবকিছু চিহ্নিত করে ধ্বংস করব।’
এই হামলার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে কি না, তা খুঁজে বের করতে পুরো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আইডিএফ জানিয়েছে, শুক্রবার সকালেই দুই বন্দুকধারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে কয়েক মিনিট ধরে তীব্র গোলাগুলি চলে। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে একজন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, গোলাগুলি অন্তত ২০ মিনিট ধরে চলছে এবং ঘটনাস্থল থেকে আহতদের সরিয়ে নিতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন।
আইডিএফ জানিয়েছে, হামলাকারীদের ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটিতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ছিল। পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর আইডিএফের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ছিল। যোদ্ধাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’
তিনি জানান, গাড়িতে থাকা গোলাবারুদগুলো আরও বড় পরিসরে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল। জামির আরও বলেন, আইডিএফ সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান আরও বাড়াবে এবং এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করবে। এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা হামাসের সন্ত্রাসী এবং যারা তাদের পাঠিয়েছে, তাদের যেখানেই থাকুক এবং সব সময় তাড়া করব।’
তবে হামাস এই হামলার প্রশংসা করে বিবৃতি দিলেও এর দায় স্বীকার করেনি।
এস এম/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬







