বোয়িংয়ের পর ১০ এয়ারবাস! ইউকে-ইউরোপীয় কূটনৈতিক ভারসাম্য নাকি বিমানের এভিয়েশন হাবের মহাস্বপ্ন?

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর – বাংলাদেশি এভিয়েশন খাতে বইছে একের পর এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাওয়া! মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের পর এবার ইউরোপীয় বিমান প্রস্তুতকারী জায়ান্ট এয়ারবাস (Airbus)-এর কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বুধবার রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শীর্ষক এক বিশেষ সমারোহে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিমানের বহর শক্তিশালী করতে সব মিলিয়ে মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা এলো।
আন্তর্জাতিক আকাশপথে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার এই মেগা রূপরেখায় যেমন রয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, তেমনই নজর কাড়ছে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
১. এয়ারবাস থেকে কোন মডেলের বিমান আসছে?
বিমানের তথ্য অনুযায়ী, বহর আধুনিকীকরণ ও নতুন নতুন আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এয়ারবাসের থেকে দুই মডেলের উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হচ্ছে:
৪টি সুপ্রশস্থ A350-900 (ওয়াইড-বডি): দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় রুটে যাত্রী পরিবহনে এই মডেলটি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও দারুণ জ্বালানি সাশ্রয়ী।
৬টি ন্যারো-বডি A321neo: আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের পথগুলোতে দক্ষতার সাথে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এই উড়োজাহাজগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
এই ১০টি এয়ারবাস কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে বিমান বা এয়ারবাসের পক্ষ থেকে গোপনীয়তা বজায় রাখা হলেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে যাতে ২০৩০ সালের আগেই এগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
২. কূটনৈতিক চাপ নাকি যাত্রী চাহিদা?
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে মন্তব্য করেন, ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনা “গুরুত্বপূর্ণ” এবং বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি “ভালো পরীক্ষা”।
তার সেই বক্তব্যের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ২৯ সেপ্টেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে ১০টি এয়ারবাস কেনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। তবে ভূরাজনৈতিক চাপ খারিজ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত স্পষ্ট জানিয়েছেন:
> “কোনো ভূরাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপে পড়ে নয়, বরং আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং যাত্রী চাহিদার বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এসব উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।”
৩. এবার ইউরোপীয় জায়ান্ট ‘লুফথানসা’র সঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ
বাংলাদেশকে বিশ্বমানের এভিয়েশন হাব (Aviation Hub) হিসেবে গড়ে তুলতে কেবল উড়োজাহাজ কেনাই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগী হয়েছে সরকার। জার্মানির শীর্ষ বিমান সংস্থা **লুফথানসা (Lufthansa)-র প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়:
এমআরও (MRO) সেন্টার স্থাপন: বাংলাদেশে উড়োজাহাজের আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (Maintenance, Repair and Overhaul) কেন্দ্র স্থাপনে লুফথানসার বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
দক্ষ জনবল ও কার্গো রফতানি: এভিয়েশন খাতে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি ২০১৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘হাই রিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল’ বিধিনিষেধ কাটাতে আলোচনার গতি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
৩৫টি নতুন বিমানে রূপান্তরের স্বপ্ন: বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে বোয়িংয়ের ২৫টি এবং এয়ারবাসের ১০টি—সব মিলিয়ে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করছে।
তবে বিশাল এই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিনিয়োগকে সফল করতে হলে উড়োজাহাজগুলোর দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড আনা, হজ ও সাধারণ যাত্রীসেবা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক রুট ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব আনাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বুধবারের এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও সাউথ এশিয়ার এমডি ইয়োর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার উপস্থিত থাকবেন।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬
FAQ
১. বিমান বাংলাদেশ কতটি Airbus বিমান কিনছে?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স Airbus-এর কাছ থেকে মোট ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে যাচ্ছে।
২. Airbus-এর কোন কোন মডেল কিনছে বিমান?
প্যাকেজে রয়েছে ৪টি A350-900 wide-body এবং ৬টি A321neo narrow-body বিমান।
৩. Airbus চুক্তি কবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা?
চুক্তিটি ৭ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকায় স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
৪. Boeing ও Airbus মিলিয়ে মোট কতটি নতুন বিমান হবে?
Boeing-এর ২৫টি এবং Airbus-এর ১০টি মিলিয়ে পরিকল্পিত নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা ৩৫টি।
৫. Airbus বিমান কবে থেকে পাওয়া যেতে পারে?
সরকার ২০৩০ সালের আগেই ডেলিভারি শুরু করানোর চেষ্টা করছে। তবে এটি বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য; নিশ্চিত ডেলিভারি সূচি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
৬. Lufthansa-এর সঙ্গে বাংলাদেশের কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে?
বাংলাদেশে MRO সুবিধা গড়ে তোলা, দক্ষ এভিয়েশন জনবল তৈরি, বাংলাদেশ-জার্মানি বিমান যোগাযোগ এবং EU-এর High Risk Cargo and Mail মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।







