আবরার ফাহাদ হত্যার ৭ বছর: আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষা, দ্রুত রায়ের প্রত্যাশায় পরিবার

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর – বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট—দুই ধাপেই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখার পর মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির জন্য ঝুলে রয়েছে।
দীর্ঘ ক্ষোভ ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে হাইকোর্টের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন আবরারের পরিবার ও বিচারপ্রার্থীরা।
‘একদিনও শুনানি মুলতবি চাওয়া হবে না’: অ্যাটর্নি জেনারেল
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের জোরালো অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে জানান, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না এবং এমনকি একদিনের জন্যও শুনানি মুলতবি চাওয়া হবে না।
সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা: দেশের নাগরিকদের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির তড়িৎ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে চায়।
ফ্যাসিবাদের নজিরবিহীন উদাহরণ: আবরার হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংঘটিত অপরাধের ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “ক্ষমতার দাপটে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, এই মামলার রায় প্রমাণ করেছে যে অপরাধীকে শাস্তির মুখোমুখি হতেই হয়।”
পরিবারের আকুতি ও আসামিপক্ষের প্রতিক্রিয়া
আবরার ফাহাদ হত্যার দীর্ঘ সময় পার হলেও চূড়ান্ত সাজা কার্যকর না হওয়ায় চরম উদ্বেগ ও কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি আপিল বিভাগে শুনানির ব্যবস্থা করতে সম্প্রতি সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন আবরারের স্বজনরা।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চার-পাঁচজন আসামির পক্ষে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল আবেদন করা হয়েছে। শুনানি শুরু হলে সর্বোচ্চ আদালত থেকে আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।
বহাল থাকা সাজা এক নজরে
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামি:
মেহেদী হাসান (রাসেল), মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান (রবিন), ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল (জেমি), মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামি:
মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।
ফিরে দেখা: সেই ট্র্যাজিক রাত
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।
এই নৃশংস ঘটনার পর পুরো দেশজুড়ে তুমুল আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, যা ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টেও পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রাখা হয়।
এখন আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় এবং ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক বিচারিক সমাপ্তির দিকেই নজর পুরো দেশের।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬







