দক্ষিণ এশিয়া

এআই বিপ্লবে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবন: ভারতের নারীদের আয়ের নতুন দিগন্ত

নয়াদিল্লি, ০৫ অক্টোবর – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির নজিরবিহীন উত্থান ভারতের প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মেগাসিটিগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে এআই প্রযুক্তির ছোঁয়া এখন পৌঁছে গেছে ভারতের মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এর ফলে আগে যেসব নারী নানা সামাজিক ও পারিবারিক বিধিনিষেধের কারণে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারতেন না, তাঁদের জন্য তৈরি হয়েছে আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বাবলম্বিতার অভূতপূর্ব সুযোগ।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ‘ডিডব্লিউ’ (DW) এবং ‘ওমান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালাসহ বিভিন্ন টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরের হাজার হাজার শিক্ষিত নারী এখন ঘরের কাছে বসেই এআই ইন্ডাস্ট্রির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।

এআই প্রযুক্তিতে ডেটা লেবেলিং/অ্যানোটেশন কী ও কেন প্রয়োজন?

যেকোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমকে দক্ষ করে তুলতে বিশাল পরিমাণ তথ্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন হয়, যাকে প্রযুক্তি খাতে ‘ডেটা অ্যানোটেশন’ (Data Annotation) বা ‘ডেটা লেবেলিং’ বলা হয়:

মেশিনকে চেনানোর কাজ: উদাহরণস্বরূপ—একটি সায়ত্বশাসিত (Self-driving) গাড়ি তৈরির জন্য হাজার হাজার ছবির মধ্যে রাস্তা, ট্রাফিক সিগন্যাল, পথচারী ও অন্যান্য গাড়িকে আলাদা করে ট্যাগ বা চিহ্নিত করতে হয়।

সহজ দক্ষতার কাজ: সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা প্রোগ্রামিংয়ের মতো জটিল কোডিং দক্ষতা না থাকলেও ছবি ও তথ্য দেখে সঠিক লেবেল দেওয়ার এই কাজ খুব সহজেই আয়ত্ত করা যায়।

নারীদের বিপুল অংশগ্রহণ: ঘরে বসে বা নিজ এলাকার ছোট প্রযুক্তি সেন্টারে বসে কাজ করার সুযোগ থাকায় গ্রামীণ এলাকার নারীরা বিপুল সংখ্যায় এ কাজে যোগ দিচ্ছেন।

কেরালার ‘ইনফোকস’ ও রোশনির স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প

কেরালার কসরগোড়ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইনফোকস’ (Infoks) ২০১৬ সালে মুজিব কোলাসেরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি বড় বড় সিটির বাইরে ছোট শহরের শিক্ষিত নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে:

জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা: ইনফোকসের একজন ডেটা অ্যানোটেটর রোশনি এম। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে তিনি কাজ শুরু করেন।

স্বাবলম্বিতার অনুভূতি: রোশনি বলেন, “আমি এখন নিজেকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ মনে করি। আমি আয় করছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। আর্থিক স্বাধীনতা সত্যিই আলাদা এক অনুভূতি। আমরা নিজেদের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের জন্যও উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে পারছি।”

সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন: আগের প্রজন্মের নারীদের যেখানে শিক্ষার সুযোগ পেতেই সংগ্রাম করতে হতো, সেখানে বর্তমান অবকাঠামো ও ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন প্রজন্মের নারীদের কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে।

মেট্রোপলিটন থেকে মফস্বলে এআই প্রতিভার বিকাশ

এতদিন ভারতের প্রযুক্তি খাত কেবল বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে বা চেন্নাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে:

টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরের উত্থান: লখনউ, জয়পুর, পাটনা, ইন্দোর ও কোয়েম্বাটোরের মতো ছোট ও মাঝারি শহরগুলো এখন এআই ডেটা হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ: বর্তমানে ভারতে প্রতি ৫ জন এআই শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জনই আসছেন এই ছোট শহর ও মফস্বল এলাকাগুলো থেকে।

তবে এই নতুন সম্ভাবনার মধ্যেও গ্রামীণ অঞ্চলে বেতন বৈষম্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পর্যাপ্ত বিকল্প চাকরির অভাবের মতো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তি খাতের এই রূপান্তর কেবল ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিকেই চাঙ্গা করছে না, বরং এআই-এর হাত ধরে লক্ষাধিক নারীর জীবনে আনছে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মমর্যাদা।

এনএন/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language