জাতীয়

৪৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন! ঢাকায় শুরু হচ্ছে পাতাল ও উড়াল পথের মহাজজ্ঞ

ঢাকা, ০১ অক্টোবর – রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের জানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনায় আরও একধাপ এগিয়ে গেল বহুল কাঙ্ক্ষিত মেট্রোরেল প্রকল্প। লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর রুট)-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও পূর্তকাজের জন্য প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ–সংক্রান্ত আটটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তাহলো—বেশ কয়েকটি মেগা প্যাকেজে সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে দরপত্রের খরচ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে!

৪৬ হাজার কোটির মহাজজ্ঞ: কোথায় কীভাবে খরচ হচ্ছে এই টাকা?

ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাটির নিচে (পাতাল) এবং ওপর (উড়াল)—দুই প্রকৌশলেই নির্মিত হচ্ছে এই নতুন রুট দুটি। অনুমোদন পাওয়া ও সুপারিশকৃত মূল প্যাকেজগুলোর বিস্তারিত চিত্র:

১১,৫ ৯০ কোটি টাকার পাতাল পথ (লাইন-১, সিপি-০৬): বাড্ডা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫.১৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পথ নির্মিত হবে। এর মধ্যে থাকছে ৪.১৫ কিলোমিটারের দুটি সুড়ঙ্গ এবং ৩টি আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন (বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত)।

১১,০৬৫ কোটি টাকায় বিদ্যুতায়ন ও ট্র্যাক (লাইন-১, সিপি-০৯): রেলট্র্যাক স্থাপন, ১৩২ কেভি রিসিভিং উপকেন্দ্র এবং ১,৫০০ ভোল্টের ওভারহেড বিদ্যুৎব্যবস্থা বসাবে ভারতের এলঅ্যান্ডটি ও সুমিতোমোর যৌথ উদ্যোগ।

৬,৪৪৬ কোটি টাকার সংকেত ও টেলিকম (লাইন-১, সিপি-১০): প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাজ পাচ্ছে ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো।

৪,২৮৫ কোটি টাকায় বিশাল ডিপো (লাইন-১, সিপি-০২): ওয়ার্কশপ, অপারেশনাল সেন্টার ও বিভিন্ন উপকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব পেয়েছে সিনোহাইড্রো ও এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ।

২,৬৭১ কোটি টাকায় উড়াল পথ ও ৫ স্টেশন (লাইন-৫, সিপি-০৩): হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুনবাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল পথ এবং ৫টি আধুনিক উড়াল স্টেশন নির্মিত হবে।

প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে খরচ বেশ বাড়তি!

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের কারণে প্রধান প্যাকেজগুলোতে সরকারের নির্ধারিত অনুমিত বাজেটের চেয়ে দরপত্র বেশ চড়া হিসাব করা হয়েছে:

পাতাল পথ নির্মাণে ৩২.০৫% বৃদ্ধি: বিমানবন্দর রুটের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও স্টেশন নির্মাণের জন্য জাপানের নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডার যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাবিত দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ৩২.০৫ শতাংশ বেশি।

বিদ্যুতায়নে ৪৯.৯২% বেশি: ট্র্যাক ও পাওয়ার সিস্টেম স্থাপনে এলঅ্যান্ডটি-সুমিতোমোর প্রস্তাবিত দর সরকারি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৪৯.৯২ শতাংশ বেশি।

সংকেত ও টেলিকমে ৫০.৮৯% লাফ: লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর সর্বনিম্ন দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৫০.৮৯ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

লাইন-১ এবং লাইন-৫: মেগাসিটির যোগাযোগের নতুন মানচিত্র

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এবং বাংলাদেশ সরকার ও জাইকা (JICA)-এর যৌথ অর্থায়নে এই দুটি রুট ঢাকার উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলকে যুক্ত করবে:

১. লাইন-১ (বিমানবন্দর ও পূর্বাচল রুট): এটি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর (পাতাল) এবং নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল (উড়াল)—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রথম পাতাল ও উড়াল মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক তৈরি করবে।

২. লাইন-৫ উত্তর রুট (গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি): রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর হয়ে দাসেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

“উভয় প্রকল্পের সংশোধিত রূপরেখা একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।”

প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে বাস্তবায়নের খরচ কিছুটা বাড়লেও দ্রুতবর্ধনশীল মেগাসিটি ঢাকার অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ও যানজট দূর করতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই দুটি নতুন মেট্রো রুট পুরোপুরি চালু হলে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় সূচিত হবে এক নতুন অধ্যায়। তবে নির্ধারিত সময়ে সঠিক মান বজায় রেখে কাজ শেষ হওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়!

এনএন/ ০১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language