জাতীয়

শুধু টিকে থাকাই সাফল্য নয়! ৮১তম অধিবেশনে জাতিসংঘকে আয়না দেখালেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান

ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর – জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকে বিগত ৮০ বছর ধরে বিশ্বের বুক আগলে টিকে আছে। কিন্তু কেবল “টিকে থাকা”-কেই কোনো সংস্থার সফলতার একমাত্র সনদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের ঐতিহাসিক সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় এ কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে খলিলুর রহমান বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের প্রতি জনআস্থা কমে যাওয়ার কঠোর ও ‘কঠিন সত্য’ মেনে নেওয়ার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

“জাতিসংঘ কী করছে?”—বিশ্ববাসীর মূল প্রশ্ন

১৯৪৫ সালে মাত্র ৫০টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১৯৩-এ উন্নীত হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলাকে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করার সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে খলিলুর রহমান বলেন:

“জাতিসংঘের এই চার দেয়ালের বাইরে থাকা কোটি কোটি মানুষ আজ প্রশ্ন করছে না যে জাতিসংঘ এখনো টিকে আছে কি না। তাদের একমাত্র প্রশ্ন হলো—এটি আসলে বিশ্ব সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে কি না?”

বৈশ্বিক চরম বৈষম্য: সামরিক বাজেট বাড়লেও কমছে মানবিক সাহায্য

বিশ্ব অর্থনীতির চরম বৈষম্য ও ভুল অগ্রাধিকারের চিত্র তুলে ধরে তিনি কিছু উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন:

বৈশ্বিক অর্থায়নে বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তিনি বলেন, এক বছরে উন্নয়ন সহায়তা ২৩ শতাংশ কমে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সামরিক ব্যয় টানা ১১ বছর ধরে বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে এর মধ্যেও মানবতার কিছু অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন তিনি। গত এক দশকে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ সুপেয় পানি, ৯২% মানুষ বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪০% থেকে বেড়ে ৭৪%-এ পৌঁছেছে।

আস্থা ফেরাতে ৩টি জরুরি পদক্ষেপ ও আফ্রিকা প্রসঙ্গ

জাতিসংঘের প্রতি বিশ্ববাসীর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে খলিলুর রহমান তিনটি বিশেষ রূপরেখা দিয়েছেন:

১. ব্যর্থতা সৎভাবে স্বীকার করা: সংস্থার সীমাবদ্ধতা ও চরম ব্যর্থতাগুলো লুকিয়ে না রেখে প্রকাশ্যে স্বীকার করা।

২. গভীর কাঠামোগত সংস্কার: সাময়িক বাজেট কাটাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আমূল প্রশাসনিক পরিবর্তন।

৩. বহু অংশীজনদের সম্পৃক্ততা: প্রযুক্তিবিদ, তরুণ, বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।

নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকান আসন:

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আফ্রিকার অনবদ্য অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে তিনি নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী আসনের জন্য শক্তিশালী দাবি জানান। তিনি সরাসরি বলেন, “আফ্রিকার प्रतिनिधियों জন্য সিদ্ধান্তের টেবিলে একটি আসন প্রয়োজন, মেনুতে থাকার জন্য নয়।”

এআই পরিচালনা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে অবস্থান

প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সভাপতি খলিলুর রহমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ন্ত্রণ ও ঘৃণামূলক বক্তব্য (Hate Speech) ছড়ানোর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এআই যেন কোনো দেশের সামরিক প্রতিযোগিতার অংশ না হয়।

বক্তব্যের শেষভাগে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জাতিসংঘের এই দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগের জন্য যখন প্রয়োজন গভীর রোগনির্ণয় ও সুদূরপ্রসারী চিকিৎসা পরিকল্পনা, তখন সাময়িক ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার দিন শেষ।”

এনএন/ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language