স্পেন

ইউরোপে পাঠানোর নামে আটলান্টিকে ভাসিয়ে দেওয়ার ফাঁদ! স্পেনে বিচার শুরু বাংলাদেশি ‘মাস্টারমাইন্ড’ মানবপাচার চক্রের

মাদ্রিদ, ২০ সেপ্টেম্বর – ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশি তরুণদের জনপ্রতি ১৩ হাজার ইউরো (প্রায় ১৬-১৭ লাখ টাকা) গুণে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর কথা বলে শেষ পর্যন্ত তুলে দেওয়া হতো আটলান্টিক মহাসাগরের চরম ঝুঁকিপূর্ণ ছোট রাবারের নৌকায়। আফ্রিকার মৌরিতানিয়া থেকে পরিচালিত এই ভয়ংকর আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মূল হোতা ‘মাস্টারমাইন্ড’ নামে পরিচিত এক বাংলাদেশি। তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের পাঠানো ৭৩টি নৌযানে করে অন্তত ৩,৬০০ মানুষকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল উত্তাল সমুদ্রে, যার মধ্যে পথেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮০ জন! এবার সেই ভয়ংকর অপরাধের বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে স্পেনের লাস পালমাস আদালতে।

তদন্তের আলোয় অপরাধ চক্রের রূপরেখা

স্প্যানিশ পুলিশ ও মৌরিতানিয়ার আধা-সামরিক বাহিনীর (জন্দারমেরি) যৌথ অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে এশিয়ার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঘিরে গড়ে ওঠা আফ্রিকার এই নির্মম মানবপাচার নেটওয়ার্ক।

তদন্ত ও মামলার প্রধান তথ্যসমূহ:

1. মূল অভিযুক্ত ‘মাস্টারমাইন্ড’: ৫২ বছর বয়সী বাংলাদেশি মোহামেদ এসএস, যার মৌরিতানিয়ায় একাধিক রেস্তোরাঁ ব্যবসা ছিল। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আটক হওয়ার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে স্পেনের হাতে হস্তান্তর করা হয়।

2. সহযোগী এসএম-এর বিচার: আগামী সপ্তাহে চক্রটির আরেক সদস্য এসএম (বাংলাদেশি)-এর বিচার শুরু হচ্ছে। কৌঁসুলিরা তার ৪ বছর ৯ মাসের কারাদণ্ড দাবি করেছেন।

3. নিষ্ঠুর নির্যাতন ও জিম্মি ব্যবস্থা: ক্যানারি দ্বীপে পৌঁছানো অভিবাসীরা জানান, অতিরিক্ত টাকার জন্য তাদের অপহরণ, মারধর ও আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে জিম্মি করা হতো।

4. লজিস্টিক হাব: মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া বা মরক্কো হয়ে আনা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদের সাময়িকভাবে ভাড়া বাসায় রেখে ২০০ ইউরো করে নেওয়া হতো এবং পরে পাচারকারীদের (‘পাসাদোরেস’) ভাড়া করা নৌকায় তুলে দেওয়া হতো।

“ইউরোপে সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়ে যাদের নৌকায় তুলে দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকের ঠাঁই হয়েছে আটলান্টিকের তলদেশে।” — স্প্যানিশ তদন্তকারীদের মতে, ৩,৬০০ যাত্রীর মধ্যে অগণিত মানুষ চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযান ও বিচার প্রক্রিয়া

২০২২ সালের অক্টোবরে গ্রান কানারিয়ায় একটি ছোট নৌকা থেকে নেমেই ধরা পড়েন চক্রের অন্যতম সদস্য এসএম, যাকে চিনে ফেলেন পূর্বে বেঁচে যাওয়া অভিবাসীরা। অন্যদিকে, স্প্যানিশ আদালতের জারি করা আন্তর্জাতিক পরোয়ানা এবং দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজিরবিহীন সহযোগিতায় অবশেষে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলো এশিয়া-আফ্রিকাভিত্তিক এই বৃহৎ মানবপাচার নেটওয়ার্কটি। লাস পালমাস আদালতে চলমান এই বিচার বিশ্বজুড়ে বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন ঠেকাতে এক বড় দৃষ্টান্ত তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এনএন/ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language