ইতিহাসের ভয়াবহতম বিপর্যয়: বাংলাদেশে হামে মৃত্যু ১ হাজার ছুঁইছুঁই, সিডিসির তালিকায় শীর্ষে দেশ

ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর – একসময় হাম নির্মূলের চূড়ান্ত অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, টিকা সংগ্রহের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতার মাশুল দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানিয়েছে—বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ দৃশ্যপট। মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে দেশে ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ!
ভীতিপ্রদ পরিসংখ্যান ও সিডিসির তথ্য
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সংকটের রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
আক্রান্ত ও ভর্তি: মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯,৮৩৫ জনের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি গবেষণাগারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া ১ লাখ ৪৬ হাজারেরও বেশি রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
মৃত্যু ১ হাজার ছুঁইছুঁই: এ পর্যন্ত হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় ৯৯৯ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে (যার মধ্যে ১০০টি মৃত্যু ল্যাব টেস্টে শতভাগ নিশ্চিত)।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা: আক্রান্তদের ৮০ শতাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের কম। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি, তারা চরম সুরক্ষাহীনতায় ভুগছে।
সফল দেশ কীভাবে এমন বিপর্যয়ে পড়ল?
বিগত এক দশকে বাংলাদেশে হাম টিকার কভারেজ ছিল ডব্লিউএইচও-র সুপারিশকৃত ৯৫ শতাংশের উপরে। তবে সাম্প্রতিক ধাক্কায় তা ভেঙে পড়েছে:
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টিকাদানে ঘাটতি: ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদান (EPI) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালে একটি বড় ক্যাম্পেইন পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিল করায় কোটি কোটি শিশু সুরক্ষাবলয়ের বাইরে থেকে যায়।
টিকার ভুল ক্রয়নীতি: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হঠাৎ টিকার ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বীকার করেছেন, এই পরিবর্তনের ফলেই বাজারে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল।
ডাবল অ্যাটাক (হাম ও ডেঙ্গু): একই সাথে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব তীব্র রূপ নেওয়ায় হাসপাতালগুলোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই ডেঙ্গুতে রেকর্ড ১,৫৭১ জন ভর্তি ও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মেঝেতে শয্যা, স্যালাইন ও টিকার আকুতি
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১,৩৫০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ২,৩৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি। নির্ধারিত ৬০টি বেডে জায়গা না হওয়ায় হামে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার ওপর শিশু স্যালাইনের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে রূপ দিয়েছে চরম আর্তনাদে।
সাধারণ পরিবারগুলো কেন্দ্রগুলোতে ঘুরেও সময়মতো টিকা পায়নি বলে অভিযোগ করছেন। চার-পাঁচটি হাসপাতাল ঘুরেও বেড না পেয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ অভিভাবকেরা।
জরুরি টিকাদান ও আইইডিসিআরের তাগিদ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে জরুরি অভিযানে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সতর্ক করেছেন যে, কেবল জরুরি টিকাদানে এই ক্ষত পুরোপুরি সারবে না। বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে।
এনএন/ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬







