
অটোয়া, ২২ এপ্রিল – গানের দেশ, সুরের দেশ, ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তের জেলা সুনামগঞ্জ। হাওরের জলরাশি, বর্ষার বিস্তার এবং মানুষের সহজ জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে সুনামগঞ্জ গড়ে তুলেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ভূগোল। এ জেলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুর্বিন শাহ, শাহ আবদুল করিমসহ অসংখ্য মরমি সাধক, বাউল কবি, গীতিকার, সুরকার ও সংস্কৃতিসেবী। তাঁদের গান শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, বরং মানুষের জীবনবোধ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, সাম্য, মানবতা ও সমাজচিন্তার গভীর ভাষ্য। তাই সুনামগঞ্জের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরেখা, কানে বাজে বাউল গানের সুর, আর মনে জাগে বাংলার লোকঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
সুনামগঞ্জ আজ কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই। এ জেলার মানুষ ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে কানাডার মতো দেশে সুনামগঞ্জবাসীরা নিজেদের শ্রম, মেধা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করেছেন। কানাডার অন্যতম বৈচিত্র্যময় শহর টরন্টোতে বসবাস করছেন সুনামগঞ্জ জেলার হাজার হাজার মানুষ। তারা প্রবাসে থেকেও ভুলে যাননি নিজেদের শেকড়, ভাষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন।
আটলান্টিক পাড়ি দিয়েও সুনামগঞ্জের মানুষ যে জন্মভূমির স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গভীরভাবে ধারণ করেন, তা আবারও প্রমাণিত হলো গত ১৯ মার্চ সন্ধ্যায়। টরন্টোর হাঙ্গেরিয়ান কালচারাল সেন্টারে এদিন যেন এক টুকরো সুনামগঞ্জ জেগে উঠেছিল। সুনামগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানটি ছিল একদিকে নতুন নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আয়োজন, অন্যদিকে প্রবাসের মাটিতে সুনামগঞ্জবাসীর ঐক্য, সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক সুন্দর প্রকাশ।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে থাকেন টরন্টো ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সুনামগঞ্জবাসীসহ বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির আমন্ত্রিত অতিথিরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী এবং মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে। তাঁদের উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে সুনামগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটিকে অভিনন্দন জানান এবং প্রবাসে কমিউনিটির ঐক্য, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সংযোগ ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অভিষেক পর্বে নবনির্বাচিত কমিটির সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। উপস্থিত অতিথি ও কমিউনিটির মানুষ তাঁদের করতালির মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান। নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ সবার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, কানাডার মাটিতে সুনামগঞ্জবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মান ও ভালোবাসার বন্ধন আরও শক্তিশালী করাই হবে তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, নবনির্বাচিত এই কমিটি আগামী দিনে সুনামগঞ্জবাসীর পাশাপাশি বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব ছিল বিশেষ আকর্ষণ। নাচ, গান ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মঞ্চে উঠে আসে বাঙালি সংস্কৃতির রঙিন আবহ। সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য মানেই গান, আর সেই গানের স্মৃতি প্রবাসের মঞ্চেও মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে গভীর আবেগ। শিল্পীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন উপস্থিত অতিথি ও দর্শকরা। করতালি, হাসি এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে তৈরি হয় এক আন্তরিক উৎসবমুখর পরিবেশ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল ভোজের আয়োজন। নাচ, গান, বক্তব্য ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর সম্মিলিত ভোজ অনুষ্ঠানকে আরও আন্তরিক করে তোলে। খাবারের টেবিল ঘিরে চলতে থাকে আলাপচারিতা, হাসি ও কুশল বিনিময়। অনুষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং উপস্থিতির ব্যাপকতা প্রমাণ করেছে, টরন্টোতে সুনামগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন এখন কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং একটি শক্তি, একটি পরিবার। অনেকেই মনে করেন, এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং প্রবাসে সম্পর্ককে নতুন করে দৃঢ় করার এক সুন্দর উপলক্ষ।
২২ এপ্রিল ২০২৬









