
ঢাকা, ২৬ জুন – রাজধানীর মিরপুরে প্রায় ৪০০ বিঘা জমি বেদখল। অনেক দিন ধরে সরকারের এসব জায়গা রহস্যজনক কারণে দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। এ জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১-এর আওতাধীন, যার সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
এসব জমির বাজারমূল্য সরকার নির্ধারিত মূল্যের দুই-তিনগুণ বেশি হবে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী লোকদের সমন্বিত অসাধু চক্র এসব জমি বেদখল করে রেখেছে। এর থেকে তারা বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পাচ্ছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ একটি সরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান। প্রেষণের কর্মকর্তাদের দিয়ে সংস্থাটি পরিচালিত হয়ে আসছে। কিছুদিন পরপর কর্মকর্তাদের রদবদল হয়। প্রত্যেক রদবদলের সময় সাময়িকভাবে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের আয়োজন করা হয় এবং কিছুদিন না যেতেই তা থেমে যায়। কারণ অবৈধ দখল অবসানের গোপন অফিস আদেশ অসাধু চক্রের মাধ্যমে দখলদারদের কাছে চলে যায়। তারা উচ্চ আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। তারা কিছু মানবিক প্রসঙ্গের কথা আদালতকে বলে। কখনো দখলদারদের সঙ্গে হাত মেলান কর্মকর্তারাও। ফলে বছরের পর বছর ধরে সরকারের মূল্যবান জমি বেদখল হয়ে থাকছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাগৃকের মিরপুরের বেদখল জায়গাগুলো কয়েকটি সেকশনে ছড়িয়ে রয়েছে। এসবের কোনোটির পাশের সড়ক ২০ ফুট, কোনোটির ৪০ ফুট এবং কোনোটি ১০০ ফুট; দামেরও ভিন্নতা রয়েছে। কোনোটির দাম কাঠাপ্রতি ১ কোটি টাকা, কোনোটির ৬৫ লাখ, কোনোটির ৫০ লাখ এবং কোনোটির আরও কিছু কম। বেদখল জায়গাগুলোর কাঠাপ্রতি গড় দাম ৫০ লাখ টাকা। সে হিসাবে ৪০০ বিঘা জমির সরকারি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। বাজারমূল্য অনুযায়ী দাম দুই বা তিনগুণ বেশি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১-এর আওতাধীন মিরপুরের বেদখল জায়গা দখলমুক্ত করতে সংস্থাটির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন তৎপরতা চালাচ্ছে। কারণ এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব বিষয়টি বিশেষভাবে দেখছেন। মন্ত্রণালয়ের চাপে জাগৃকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও তোড়জোড় শুরু করেছেন। এত কিছুর পরও এ উদ্যোগ অসাধু চক্রের কাছে হার মানবে কি না, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। কারণ দখলদার-চক্রে স্থানীয় রাজনৈতিক লোকেরাও রয়েছে।
জানা গেছে, বেদখল জমির তালিকায় রয়েছেÑ মিরপুর সেকশন-১-এর ব্লক এ-এর প্রধান সড়কের ৯২, ৯৩, ৯৪, ৯৫ ও ৯৬ নম্বর প্লট; একই সেকশন ও ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯৭, ৯৮ ও ৯৯ নম্বর প্লট এবং ২ নম্বর সড়কের ১০০, ১০১, ১০২, ১০৩, ১০৪ ও ১০৫ নম্বর প্লট। প্রায় সাত বিঘা জমি। গৃহায়নের নকশায় ওই জায়গা প্লট হিসেবে বিন্যস্ত থাকলেও বাস্তবে সেখানে রয়েছে স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেট। সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরপুর-১ নম্বর চত্বরসংলগ্ন জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে এ মার্কেট।
ওই মার্কেটে প্রায় ১ হাজার ২০০টি দোকান রয়েছে। ছোট-বড় বিভিন্ন আয়তনের। মাসে ৫ হাজার থেকে লাখ টাকা ভাড়ার দোকানও রয়েছে। গড় ভাড়া ১০ হাজার টাকা ধরলেও মাসিক ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ন্যূনতম ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন টিটুর ছত্রছায়ায় ওই মার্কেট গড়ে উঠেছে। মার্কেট গড়ে তুলেছেন তারই ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন লিটু; তিনি মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে রয়েছেন। টিটু কাউন্সিলর থাকার সময় ওই জায়গা দখল করেছেন তার ভাই। অ্যাডভান্স নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। তারাই ভাড়া আদায় করছেন। মার্কেটটি সরকারি না বেসরকারিÑ এমন প্রশ্নে বিব্রত বোধ করেন দোকানদাররা। প্রতিবেদকের পেশাগত পরিচয় জেনে অনুরোধ করেন তাদের নাম ও পরিচয় না জানাতে। তারা বলেন, ‘টিটু ও লিটু ভাই মার্কেট গড়েছেন। তারা দাবি করেন, তারাই এ জমির মালিক। তবে তাদের কানে এসেছে, এ জায়গা সরকারের। তারা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন, এতসব বুঝে তাদের লাভ নেই।’
সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল হোসেন টিটু বলেন, ‘ওই মার্কেটটি আমার ছোট ভাই লিটু গড়ে তুলেছে। সঙ্গে ওর বন্ধুরাও রয়েছে। তখন আমি কাউন্সিলর ছিলাম বলে সবাই আমাকে দোষারোপ করে। যদিও আমি এর কিছুই জানি না।’ তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর চাইলে তিনি প্রতিবেদককে একটি নম্বর সরবরাহ করেন। ওই নম্বরে বারবার ফোন দেওয়া হলেও কখনো চালু পাওয়া যায়নি।
মিরপুর সেকশন-১-এর জি ব্লকের প্রধান সড়কে ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর প্লটের প্রায় ১৫ বিঘা জমি বেদখল। এসব জায়গায় অস্থায়ী সেমিপাকা স্থাপনা (দোকানঘর) তুলে করে ভাড়া-বাণিজ্য চলছে। সেকশন-১১-এর ‘২৬০০ বাস্তুহারা প্রকল্প’-এর প্রায় ৭০ বিঘা জায়গা ছোট-বড় বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে বেদখল করে রাখা হয়েছে। ওই জায়গার অর্ধেক অংশে সরকার স্বপ্নচূড়া প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বেদখল থাকায় ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। সেকশন-৯-এ স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের উত্তর পাশের এলাকার প্রায় ৬০ বিঘা জমি বেদখল। সেখানে বিভিন্ন অবৈধ আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ওই জায়গা উদ্ধারে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হলেও উচ্ছেদ কাজ শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ উচ্ছেদের দায়িত্ব দিয়ে আবার ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে ঢাকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে নিয়োজিত করা হয়েছে। সেকশন-৭-এর ৬৯ বিঘা জমি বেদখল। সেখানে এলাকার প্রভাবশালীরা বস্তি গড়ে তুলে ভাড়া-বাণিজ্য করছে। নাম চলন্তিকা বস্তি। বস্তিতে একটি ফ্ল্যাট প্রকল্পের সাইনবোর্ডও ঝোলানো হয়েছে। সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেকশন-৯-এর পল্লবী থানা এলাকায় প্রায় ১৮০ বিঘা জমি বেদখল। কিছু অংশে অবৈধ দোকানপাট, বাজার বসানো হয়েছে। কিছু অংশ অবাঙালিদের দখলে রয়েছে। অবাঙালিদের জন্য একটি আবাসন প্রকল্প করে সেখানে তাদের স্থানান্তরিত করে জমি দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবী বলেন, ‘দায়িত্ব পেয়ে তিনি বেদখল জমি চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। এখন জমিগুলো উদ্ধারের তৎপরতা চলছে। শিগগির বেদখল সব জায়গা দখলমুক্ত করা হবে।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মুনিম হাসান বলেন, ‘মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বেদখল জমির পরিমাণ অনেক। তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত কিছু বেদখল জায়গা উদ্ধারের তৎপরতা চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সব বেদখল জায়গা দখলমুক্ত করা হবে।’
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে তাদের বেদখল জায়গার তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখনো তারা তালিকা জমা দেয়নি। আবার তাদের তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে। তালিকা হাতে নিয়ে আগামী জুলাইয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করা হবে।’
সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ২৬ জুন ২০২৩








