জাতীয়

তাহসিফের মৃত্যু রহস্য: ৬ ঘণ্টার আদ্যোপান্ত ও রহস্যজনক সেই ‘দীপ’ এখন নৌ পুলিশের হাতে

ঢাকা, ৩১ অক্টোবর – বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মর্মান্তিক মৃত্যুর রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে সাবেক এই পাইলটের সাথে শেষ প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় কাটানো তার সেই ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে অবশেষে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে পিবিআইয়ের হেফাজতে নেওয়া হয় দীপকে। এরপর শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দিনভর নানা নাটকীয়তা ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তাকে নৌ পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

যেভাবে সামনে এল দীপের নাম ও পিপিআইর অভিযান

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই ঘর ছেড়েছিলেন তাহসিফ। সিসিটিভি ফুটেজেও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উত্তরার একটি গ্যারেজে তাদের দুজনকে একসাথে দেখা গিয়েছিল। এরপরই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরের দিন বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করা পিবিআই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত বৃহস্পতিবার রাতে দীপের অবস্থান শনাক্ত করে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে তাকে আটক করে।

টঙ্গীর মাঠে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও মোটরসাইকেল উদ্ধার

শুক্রবার দীপকে সাথে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকার ২৯ নম্বর সীমানা পিলার সংলগ্ন মাঠে যায় পিবিআইয়ের তদন্ত দল। দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেখান থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়, যা মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল। উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা যাচাইয়ের জন্য কাগজপত্র ও চেসিস নম্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দীপের দাবি বনাম তদন্তে অসংগতি

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে তারা দুজনে তুরাগ নদসংলগ্ন ওই মাঠে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ পুলিশ ইউনিফর্ম পরা দুই ব্যক্তিসহ কয়েকজন তাদের ধাওয়া করলে তাহসিফ ভয় পেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। আর দীপ নিজে ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে থেকে পালিয়ে যান।

তবে দীপের এই বক্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা:

একাধিক বয়ান: দীপ ঘটনাস্থলে যাওয়ার বিষয়ে একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। এমনকি প্রথমে সেখানে যাননি বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

পুলিশের ইউনিফর্মের সত্যতা: ধাওয়াকারীরা আসলেই পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না কিংবা তাদের সেখানে কোনো ডিউটি ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পিবিআইয়ের।

যোগাযোগের তথ্য: নিখোঁজ হওয়ার আগে ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীপের সাথে তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল। নিহত তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

বাবার চোখে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

মৃত তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নারাজ। দীপের ‘নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার’ দাবি উড়িয়ে দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তার ছেলে সাঁতার জানতেন এবং বিমানবাহিনীর পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের বিশেষ কোর্সও সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি এই ঘটনার পেছনে গভীর কোনো রহস্য বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা প্রকাশ করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।

এদিকে, নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ভিসেরা ও অন্যান্য নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। নৌ পুলিশ এখন মামলার মূল তদন্ত পরিচালনা করছে এবং পিবিআইয়ের সংগৃহীত সমস্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে পুরো ঘটনা উন্মোচনের চেষ্টা চলছে।

এনএন/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language