না জানিয়ে সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: জেদ্দা কনস্যুলেটের ‘গোপনীয়’ চিঠিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঢাকা, ২১ অক্টোবর – সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ ও ব্যভিচারের মতো অভিযোগে নজিরবিহীনভাবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো—গ্রেফতার, বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত এই বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দা কনস্যুলেটকে কিছুই জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। নজিরবিহীন এই ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি ‘গোপনীয়’ চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয়।
উচ্চপর্যায়ের এই চিঠির তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণী মহলে।
‘গোপনীয়’ চিঠিতে উঠে এলো যেসব তথ্য
জেদ্দা কনস্যুলেটের শ্রম উইং থেকে পাঠানো গোপন চিঠির সূত্র অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার। তাঁরা দুজনেই সৌদি আরবের ‘আল মাজাল কোম্পানি’তে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আটকের সময়কাল ও অভিযোগ: ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সাইবার অপরাধ আইনে আটক করা হয় নজরুলকে। ঠিক তার পরদিন (২ আগস্ট) ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার।
কারাগার: নজরুল জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি জেদ্দা মহিলা কারাগারে আটক ছিলেন।
চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে—সৌদি আরবে সাইবার আইন কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে এর আগে কখনো কোনো বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ইতিহাস বা নজির নেই।
বিচারপ্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক অস্পষ্টতা
সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের হাতে আসা বন্দিদের তালিকায় এই দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তালিকার ৭ নম্বর কলামে রায় ঘোষিত কয়েদিদের সাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকার কথা থাকলেও, নজরুল ও সুইটির সাজার ঘরের তথ্যটি সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল।
কনস্যুলেটের চিঠিতে উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি সীমাবদ্ধতা ও ধোঁয়াশা:
দূতাবাসকে অন্ধকারে রাখা: মৃত্যুদণ্ড প্রদান কিংবা তা কার্যকর করা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলকে বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত দেয়নি।
আইনি সহায়তা ও দোভাষীর সুযোগ: বর্তমানে সৌদি ক্রিমিনাল কোর্টসহ অন্যান্য আদালতে ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহাদ’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজস্ব অনুবাদক দিয়ে বিচারিক শুনানি পরিচালনা করা হয়। ফলে এসব কোর্টে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষে আসামির সমর্থনে অনুবাদক হিসেবে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এমনকি বিচার চলাকালে ওই দুজনের পক্ষে কোনো দোভাষী বা আইনি প্রতিনিধিত্ব ছিল কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবারের নিষ্ক্রিয়তা: সংশ্লিষ্ট দুই বন্দির পরিবারের পক্ষ থেকেও আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য আগে থেকে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি।
সৌদি কারাগারে বাংলাদেশি বন্দিদের চিত্র
জেদ্দা কনস্যুলেটের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে কেবল চারিত্রিক সংক্রান্ত মামলাতেই বর্তমানে ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। এর মধ্যে ১৪৭ জনের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং তাদের সর্বনিম্ন ১ মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মক্কায় সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের পৃথক তিনটি মামলায় অন্য বন্দিদের ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ
বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে ইতোমধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে মিশন। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও রায়ের নথি পেতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ (Diplomatic Note) পাঠানো হয়েছে। মামলার বিস্তারিত ও রায়ের সার্টিফাইড কপি হাতে পেলেই সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করা হবে বলে জানিয়েছে কনস্যুলেট।
এনএন/ ২১ অক্টোবর ২০২৬







