৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চুয়েট ভিসিকে উদ্ধার! ‘ক্যাম্পাসে আর ফিরতে পারবেন না’ শর্তে মুক্ত

চট্টগ্রাম, ১৩ অক্টোবর – চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) তীব্র উত্তেজনা ও নাটকীয়তার অবসান! নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় অবরুদ্ধ রাখার পর অবশেষে উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলমের উপস্থিতিতে তাকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে আনা হয়।
তবে তাকে ক্যাম্পাস ছাড়তে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব শর্ত বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা—‘ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে একটি মাত্র শর্তে, তিনি আর কখনো চুয়েটে ফিরবেন না!’
মাইক হাতে আন্দোলনকারীদের এমন ঘোষণার পর তীব্র স্লোগান ও ক্ষোভের মুখেই পুলিশি কড়া নিরাপত্তায় অসুস্থ উপাচার্যকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাসের বাইরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
কীভাবে তৈরি হলো এই চরম সংকট ও ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ দশা?
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগ মেনে নেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটে চলছিল ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও কর্মবিরতি।
ঘটনার ধারাবাহিকতা:
ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে তালা ভাঙা: তীব্র আন্দোলনের মুখে নতুন ভিসি এতদিন ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারলেও, গত সোমবার সকালে ছাত্রদল নেতাদের সাথে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন।
বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ: খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে জড়ো হন এবং আলটিমেটাম দেন। দুপুর ১২টার দিকে উপাচার্য ভবনে পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কেটে দেওয়া হয়।
ভিসি সহ ১০-১১ জন আটকা: উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম, চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদসহ বেশ কয়েকজন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী পুরো ৩০ ঘণ্টা ভবনের ভেতরে পানির তীব্র সংকট ও অন্ধকারে অবরুদ্ধ থাকেন।
চুয়েটের এই সংঘাতের নেপথ্যে কী?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নজিরবিহীন সংকট ও সহিংস পরিস্থিতির গভীরে ৩টি প্রধান কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা:
ভিসি নিয়োগ ঘিরে অসন্তোষ ও পুনর্বহালের দাবি: সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাতকে অপসারণের প্রক্রিয়া এবং কুয়েট থেকে নতুন ভিসি এনে বসানোকে কেন্দ্র করে চুয়েট পরিবারে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। চুয়েটকে ‘বাহিরাগত ভিসি মুক্ত’ করার দাবি উঠছিল শুরু থেকেই।
দলীয় রাজনীতির প্রভাবে ক্ষোভের আগুন: সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিপরীতে ছাত্রদল নেতাদের সাথে নিয়ে উপাচার্যের ভবন দখল বা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তোলে।
প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ: দীর্ঘদিন ধরে কর্মবিরতি ও শাটডাউনের কারণে ক্যাম্পাসের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে গেছে, যা শিক্ষার্থীদের সেশনজটের অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে।
“আমরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে তাদের দাবিগুলো সরকারকে জানানোর আশ্বাস দিয়েছি। ভিসি অসুস্থ বোধ করায় তাকে উদ্ধার করে আপাতত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।” — মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা (জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম)।
চুয়েটের ভবিষ্যৎ এবার কোন পথে?
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে আপাতত চরম উত্তেজনার অবসান হলেও চুয়েটে শান্তি ফিরবে কি না তা নির্ভর করছে নতুন ভিসি নিয়োগ বা পুরনো ভিসির পুনর্বহাল সংক্রান্ত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
এনএন/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬







