মিডিয়া

এফএম রেডিওতে বিবিসির সম্প্রচার বন্ধ করল তালেবান! তথ্যের আলো হারাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ

কাবুল, ১৩ অক্টোবর – আফগানিস্তানে স্বাধীন তথ্য প্রবাহ ও গণমাধ্যমের ওপর আবার বড় খড়্গ নেমে এল। দেশজুড়ে এফএম রেডিও স্টেশন থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম বিবিসির সব ধরনের সম্প্রচার সম্পূর্ণ স্থগিত করেছে তালেবান সরকার। তালেবান প্রশাসনের এক মুখপাত্র জানিয়েছে, ‘বারবার মিডিয়া আইন ও নিয়মনীতি লঙ্ঘনের’ দায়ে তারা এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ঠিক কোন নিয়ম বা খবর সম্প্রচারের কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কার্যক্রম আফগানিস্তানে বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে একমাত্র প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে বিবিসিই দেশটিতে এফএম রেডিওর মাধ্যমে সম্প্রচার চালিয়ে আসছিল।

কী বলছে বিবিসি ও তালেবান প্রশাসন?

তালেবান সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খুবাইব গুফরান স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সংবাদমাধ্যমের জন্য নির্ধারিত নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বিবিসি বারবার লঙ্ঘন করায় আপাতত সারা দেশে তাদের এফএম রেডিওর সম্প্রচার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, বিবিসি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আফগানিস্তানের কোটি মানুষ বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও নির্ভুল খবরের জন্য দশকের পর দশক ধরে বিবিসির ওপর আস্থা রেখেছেন। সৃষ্ট সংকট নিরসনে আফগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থাটি।

বিবিসি আরও নিশ্চিত করেছে যে এফএম নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও বিকল্প মাধ্যম হিসেবে পশতু, দারি ও ইংরেজি ভাষায় স্যাটেলাইট, ওয়েবসাইট, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং শর্টওয়েভ ও মিডিয়ামওয়েভ (স্বল্প ও মধ্যম তরঙ্গ) রেডিওর মাধ্যমে তারা সংবাদ পরিবেশন চালিয়ে যাবে। বিশেষ করে আফগানিস্তানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ হওয়া লাখ লাখ কিশোরীর জন্য বিবিসির প্রচারিত বিশেষ শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানগুলো এফএম বন্ধ থাকায় বড় বিপাকে পড়ল।

কেন তালেবানের নিশানায় বিবিসি?

আফগানিস্তানের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশের বেশি মানুষ প্রতি সপ্তাহে তথ্য ও বিনোদনের জন্য বিবিসির সংবাদের ওপর নির্ভর করতেন। তবে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকে সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনে ৩টি প্রধান কারণ দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা:

কঠিন বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ:

তালেবানের নতুন নিয়মে সংবাদমাধ্যমে যেকোনো ধরনের সংগীত প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া পর্দায় ও রেডিওতে নারীদের উপস্থিতি সীমিত করা হয়েছে; নারীরা পুরুষদের সঙ্গে যৌথভাবে সম্প্রচারে অংশ নিতে পারেন না। স্বাধীন সাংবাদিকতা ধরে রাখা বিবিসির পক্ষে এসব কট্টর নিয়ম শতভাগ মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

নারী শিক্ষা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত কভারেজ:

আফগান তরুণীদের শিক্ষা বন্ধের পর বিবিসি রেডিওতে বিশেষ শিক্ষামূলক পাঠদান ও সরকারের বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তুলে ধরছিল, যা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করেছে।

তথ্য পাওয়ার বিকল্প মাধ্যমের অভাব:

বর্তমানে আফগানিস্তানের একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। সেই সঙ্গে উচ্চ ইন্টারনেটের ব্যয় ও নিম্ন সাক্ষরতার হারের কারণে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া সব মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। ফলে এফএম রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া মানে সাধারণ আফগানদের মূলধারার নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।

“আফগান পরিষেবার মাধ্যমে দীর্ঘ দিন (১৯৮১ সাল থেকে) আফগান জাতিকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে আসা বিবিসি আজ আফগানিস্তানের কট্টর নীতির মুখে কঠিন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি।” — বিশ্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

স্তব্ধ বাকস্বাধীনতা ও সাধারণ আফগানদের ভবিষ্যৎ

১৯৮১ সাল থেকে আফগানদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিবিসির এই এফএম সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির সাধারণ মানুষ ও বিশেষ করে শিক্ষার অধিকার হারানো লাখো শিক্ষার্থী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ল।

এনএন/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language