জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী পদে নির্বাচিত সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান

ঢাকা, ০৮ অক্টোবর – বিশ্ব মানবাধিকারের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক নীতি-নির্ধারণী সংস্থা ‘জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ’ (UNHRC)-এর অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ উপদেষ্টা কমিটি বা অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মোহাম্মদ সুফিউর রহমান।
বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য জানানো হয়েছে। জেনেভায় আয়োজিত পরিষদটির ৬৩তম অধিবেশনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে নিরপেক্ষ ভোটাভুটিতে তিনি এই পদের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হন।
কী এই ‘অ্যাডভাইজরি কমিটি’ এবং কেন এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এত প্রভাবশালী?
সহজ ভাষায়, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ যদি কোনো বৈশ্বিক মানবিক সংকটে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা হয়, তবে এই ‘উপদেষ্টা কমিটি’ হলো পরিষদের নিজস্ব গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ থিঙ্কট্যাঙ্ক।
কাজের পরিধি: বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি মানবাধিকার পরিষদের নির্দেশে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন মানবিক সংকট, লিঙ্গবৈষম্য, প্রযুক্তি ও মানবাধিকার ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালায়।
সুপারিশের গুরুত্ব: কাউন্সিলের বিভিন্ন বৈঠকে নতুন কোনো নীতি বা প্রস্তাব পাসের ভিত্তি তৈরি করে এই কমিটির দেওয়া বিশেষজ্ঞ সুপারিশ ও আইনি মতামত।
পররাষ্ট্র ক্যাডার থেকে বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ: অভিজ্ঞতার ৩ দশকের সুদীর্ঘ রেকর্ড
১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে বিসিএস (পররাষ্ট্র ক্যাডার) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সুফিউর রহমান বাংলাদেশ কূটনৈতিক সার্ভিসের অন্যতম প্রবীণ ও দক্ষ কর্মকর্তা। প্রায় ৩৩ বছরের ক্যারিয়ারে বিশ্বমঞ্চে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন:
- ২০২২ – ২০২৪: সুইজারল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত এবং জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি, বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে বাংলাদেশের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব
- ২০১৮ – ২০২২: অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি ও প্যাসিফিক অঞ্চল (হাইকমিশনার), প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি।
- ২০১৪ – ২০১৭: মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, রাখাইন রাজ্যে চরম উত্তেজনাকালীন সময় ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সংকটের প্রারম্ভে অত্যন্ত সংবেদনশীল পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা।
- ২০১২ – ২০১৪: শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার, প্রথম রাষ্ট্রদূত পদায়ন ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার।
- ২০২৪ – বর্তমান: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এসআইপিজি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়), অবসরে যাওয়ার পর শিক্ষায়তনিক গবেষণা ও নীতি-নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা।
অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ: জাতিসংঘের এই নির্বাচনে বাংলাদেশের লাভ কোথায়?
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষজ্ঞ পদের দায়িত্ব পাওয়া কেবল ব্যক্তি সুফিউর রহমানের বড় অর্জন নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জন্য এক কৌশলগত বিজয়:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নতুন মাত্রা: মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করায় সুফিউর রহমান মিয়ানমার সরকারের ভেতরের মেকানিজম ও রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আন্তর্জাতিক এই কমিটির বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা জাতিসংঘে বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার রক্ষায় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনে সহায়ক হবে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধিকার রক্ষা: এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক নীতি-নির্ধারকদের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সহজ হবে।
কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল: আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞদের এই মূল্যায়ন বৈশ্বিক দরবারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬







